ঢাকাTuesday , 29 September 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইয়াবার নামে বিক্রি হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মাদকসেবীরা

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৭৫

নিজস্ব প্রতিবেদক :: মাত্র এক টাকার একটি ছোট গোলাকার বড়ি। বাজারে পাওয়া যায় সাধারণ ওষুধ হিসেবে। কিন্তু সেই বড়িতেই লাল বা গোলাপি রঙের প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ইয়াবার আদল। এরপর মাদকসেবীদের কাছে সেটিই বিক্রি করা হচ্ছে ‘ইয়াবা’ নামে। আর প্রতিটি বড়ির দাম নেওয়া হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত।

তবে এসব বড়ি প্রকৃত ইয়াবা নয়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ও কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ রং করে ইয়াবার মতো দেখিয়ে মাদকসেবীদের কাছে বিক্রি করছে একটি অসাধু চক্র। ফলে একদিকে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন মাদকসেবীরা, অন্যদিকে অজানা ওষুধ সেবনের কারণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, নগরীর আইডি বাগানপাড়া রেললাইন এলাকা, চন্দ্রিমা থানার বারো রাস্তা, বুধপাড়া, কোট ঢালান, গুড়িপাড়া, রাজশাহী নিউমার্কেট এলাকা ও হরিপুরসহ কয়েকটি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা হয়ে আসছে। এসব এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায় বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

ইয়াবার বদলে হাতে দেওয়া হচ্ছে ওষুধ

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৃত ইয়াবার পাশাপাশি ইয়াবার আদলে তৈরি রং করা বিভিন্ন ট্যাবলেটও বিক্রি করা হচ্ছে। এর মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি হিসেবে ব্যবহৃত ‘মায়াপিল’ এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘ডুরালাক্স’ ট্যাবলেটের নাম উঠে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব ট্যাবলেটের গায়ে লাল বা গোলাপি রঙের মার্কার কিংবা সাইনপেনের কালি লাগিয়ে ইয়াবার মতো চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে সেগুলো প্রকৃত ইয়াবা বলে মাদকসেবীদের কাছে বিক্রি করা হয়।

বিশেষ করে কম দামে ইয়াবা পাওয়ার আশায় যারা বিভিন্ন মাদক স্পটে যান, তাদের একটি অংশ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

মাদকসেবীর অভিজ্ঞতা

নগরীর আইডি বাগানপাড়ায় রাফিউল ইসলাম নামে এক মাদকসেবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান বাড়ায় কিছু বিক্রেতা প্রকৃত ইয়াবার পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের ট্যাবলেট বিক্রি করছে।

রাফিউল ইসলাম জানান, তিনি একজনের কাছ থেকে দুই পিস ‘মাল’ হিসেবে ইয়াবা কিনেছিলেন। প্রতিটি বড়ির দাম নেওয়া হয় ২৮০ টাকা করে। পরে সেগুলো সেবন করার পর বুঝতে পারেন, এগুলো প্রকৃত ইয়াবা নয়। তার ভাষ্য, বড়ি খাওয়ার পর তার পায়খানার বেগ অনেক বেড়ে যায়।

সামসুল ইসলাম নামে আরেকজন জানান, ইয়াবার মতো দেখতে করে কিছু বড়ি বিক্রি করা হচ্ছে। তার দাবি, এসবের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি রং করে বিক্রির ঘটনাও রয়েছে।

মায়াপিল আসলে কী?

চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, মায়াপিল কোনো মাদক নয়। এটি একটি যৌগিক মুখে খাওয়ার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি। এতে হরমোনজাত উপাদান থাকে, যা মূলত গর্ভধারণ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়।

মায়াপিলের ২৮টি ট্যাবলেটের প্যাকেটে সাধারণত ২১টি হরমোনযুক্ত ট্যাবলেট এবং ৭টি আয়রন ট্যাবলেট থাকে। হরমোনযুক্ত ট্যাবলেটে ইথিনাইল এস্ট্রাডিওল ও লেভোনরজেস্ট্রেল থাকে। এসব হরমোন ডিম্বস্ফোটন দমন এবং জরায়ুমুখের শ্লেষ্মায় পরিবর্তন ঘটিয়ে গর্ভধারণ প্রতিরোধে কাজ করে।

অর্থাৎ, যে বড়িটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত উদ্দেশ্যে নারীদের জন্মনিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের জন্য তৈরি, সেটিকেই রং করে ইয়াবা হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইয়াবা ভেবে মায়াবড়ি খেলে কী হতে পারে?

মায়াবড়ি ইয়াবা নয় এবং এটি মাদক হিসেবে তৈরি হয়নি। ফলে ইয়াবার মতো প্রভাব পাওয়ার উদ্দেশ্যে এ ধরনের বড়ি সেবন করলে কাঙ্ক্ষিত কোনো মাদকীয় প্রভাব পাওয়ার কথা নয়। বরং প্রয়োজন ছাড়া হরমোনযুক্ত ওষুধ খেলে শরীরে ওষুধটির স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

হরমোনাল জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহারে কিছু মানুষের বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা, স্তনে অস্বস্তি বা ব্যথা, মেজাজের পরিবর্তন এবং অনিয়মিত রক্তপাতের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। গুরুতর কিছু ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও কারও জন্য এ ধরনের ওষুধ উপযুক্ত কি না, তা চিকিৎসকের পরামর্শের বিষয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—কেউ যদি না জেনে বা ভুলভাবে বারবার এসব ট্যাবলেট সেবন করেন, তাহলে তিনি আসলে নিজের শরীরে কী ওষুধ ঢুকছে তা জানতেই পারছেন না।

ডুরালাক্স আরও ভিন্ন ধরনের ওষুধ

অন্যদিকে ডুরালাক্স ৫ মিলিগ্রাম সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ওষুধ। এর কার্যকর উপাদান বিসাকোডিল। এটি একটি স্টিমুল্যান্ট ল্যাক্সেটিভ, অর্থাৎ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ব্যবহৃত রেচক ওষুধ।

বিসাকোডিল সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা পরীক্ষার আগে অন্ত্র পরিষ্কার করতেও এটি ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু কোনো প্রয়োজন ছাড়াই এটিকে ইয়াবা মনে করে সেবন করা হলে ডায়রিয়া, পেটের অস্বস্তি, পানিশূন্যতা এবং শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত ব্যবহারে পটাশিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

‘ওষুধকে মাদক বানানোর’ নতুন কৌশল?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ইয়াবা একটি মাদকদ্রব্য। অন্যদিকে ডুরালাক্স ও মায়াবড়ি মাদক নয়। কিন্তু এসব ওষুধ রং করে ইয়াবার নামে বিক্রি করা এবং চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া সেবন করা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

তিনি বলেন, রোগ বা চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। বিশেষ করে অজানা উৎস থেকে কেনা ওষুধের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।

অপরাধ বিশ্লেষক সুব্রত কুমার পাল বলেন, সস্তা ওষুধ রং করে ইয়াবার আদলে বাজারজাত করার অভিযোগ মাদক ব্যবসার একটি নতুন কৌশল হতে পারে। প্রকৃত মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান বাড়লে অসাধু চক্র মাদকসেবীদের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প পদ্ধতিতে প্রতারণা করার চেষ্টা করতে পারে।

পুলিশের অভিযান অব্যাহত

রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, শুধু ইয়াবা নয়, সব ধরনের মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে মহানগর পুলিশ বিভিন্ন মাদক বিক্রির আস্তানায় অভিযান চালিয়ে অনেককে গ্রেপ্তার করেছে।

তবে মায়াবড়ি ও ডুরালাক্স রং করে ইয়াবার আদলে বিক্রি করার বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।

জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। ওষুধ রং করে মাদক হিসেবে বিক্রি করা নতুন কৌশল হতে পারে। সুনির্দিষ্টভাবে কারও বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবা ভেবে কোনো অজানা বড়ি খাওয়া শুধু প্রতারণার বিষয় নয়; এটি সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। কারণ একটি ট্যাবলেটের গায়ে রং বা চেহারা দেখে সেটির ভেতরে কী উপাদান রয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।

তাই মাদকসেবীদের উদ্দেশ্যে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—অজানা কোনো ট্যাবলেটকে ইয়াবা বা অন্য কোনো মাদক মনে করে সেবন না করা। কোনো ওষুধ সেবনের প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

একই সঙ্গে ইয়াবার নামে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ বিক্রির অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।