ঢাকাSaturday , 15 August 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এনবিআর-এর শহিদুলের ‘সম্পদের সাম্রাজ্য’ ঢাকায় ৫৩ ফ্ল্যাট থেকে পূর্বাচল–সাভারে জমি, বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
২০

নিজস্ব প্রতিবেদক :: এনবিআর-এর শহিদুলের ‘সম্পদের সাম্রাজ্য’ ঢাকায় ৫৩ ফ্ল্যাট থেকে পূর্বাচল–সাভারে জমি, বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ!

সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে সম্পদের বিস্তর ফারাকের দাবি • স্ত্রী-স্বজনের নামেও বিপুল সম্পত্তির অভিযোগ • শেয়ারবাজারে ৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ • ছেলের ব্যবসায় অর্থায়নের অভিযোগ • বিদেশের সম্পদ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন • শহিদুল ও পরিবারের বক্তব্য মেলেনি

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনঃ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সাবেক সদস্য এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক শহিদুল ইসলামকে ঘিরে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঢাকার অভিজাত এলাকায় বহুসংখ্যক ফ্ল্যাট ও ভবন, সাভার ও পূর্বাচলে জমি, বাণিজ্যিক দোকান, স্ত্রীর নামে শেয়ারবাজারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এবং পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের নামে সম্পদের তথ্য দাবি করা হয়েছে।
এশিয়া পোস্টের ১ জুন ২০২৬-এর এক ক্রাইম টাইমস এর নিজেস্ব প্রতিবেদক মোঃ আবু ছালেহ বিপ্লবকে জানান যে, এনবিআরের ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করা হয়, তার, স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৩টি ফ্ল্যাটসহ অন্তত ৪০০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগ–১ | বসুন্ধরায় শতকোটি টাকার ভবন ও ২০টি ফ্ল্যাট
ক্রাইম টাইমস এর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি-ব্লকে ‘শেল কবিতা’ নামে একটি ১০ তলা ভবনের সঙ্গে শহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নাম যুক্ত করা হয়েছে। ভবনটির প্রতি তলায় প্রায় আড়াই হাজার বর্গফুটের দুটি করে মোট ২০টি ফ্ল্যাট থাকার দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় আবাসন ব্যবসায়ীদের বাজারমূল্যের হিসাব উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে শুধু ফ্ল্যাটগুলোর মূল্যই প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলে অনুমান করা হয়েছে; জমিসহ পুরো সম্পত্তির মূল্য আরও বেশি হতে পারে।

অভিযোগ–২ | ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আরও ৩৩ ফ্ল্যাটঃ
শুধু বসুন্ধরা নয়—বাংলামোটর, মিরপুর, রূপনগর ও ইস্কাটনসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শহিদুল, তার স্ত্রী ও স্বজনদের নামে আরও ৩৩টি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে ক্রাইম টাইমস এর সাংবাদিকগন।
এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদনে বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারে শহিদুলের নামে দুটি ফ্ল্যাট, রূপনগরের আরামবাগ আবাসিক এলাকায় স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে ১০ ফ্ল্যাটের একটি ছয়তলা ভবন এবং ইস্কাটন গার্ডেন রোডের গার্ডেনিয়া টাওয়ারে স্ত্রীর নামে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থাকার দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ–৩ | শ্যালকদের নামে ২০ ফ্ল্যাটের ভবন
মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় প্রকল্পে ছয়তলা একটি ভবনে ২০টি ফ্ল্যাট থাকার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনের দাবি, ভবনটি প্রথমে শহিদুলের স্ত্রীর নামে নির্মিত হলেও পরবর্তীতে চার শ্যালকের নামে মালিকানা স্থানান্তর করা হয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওই চারজনের নাম কাজী মুক্তাদীর ইবনু মিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান ও কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ–৪ | ৫৩ ফ্ল্যাট ও দুই দোকানের মূল্য অন্তত ১৬২ কোটি টাকাঃ
প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, শহিদুল, তার স্ত্রী ও আত্মীয়দের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা ৫৩টি ফ্ল্যাট এবং দুটি বাণিজ্যিক দোকানের সম্মিলিত বাজারমূল্য অন্তত ১৬২ কোটি টাকা।
শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় একটি দোকান এবং নিউমার্কেটে আরেকটি দোকানের তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে। দুটি দোকানের সম্মিলিত আনুমানিক বাজারমূল্য চার কোটি টাকার বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ–৫ | বেড়িবাঁধ ও ইস্টার্ন হাউজিংয়ে কোটি কোটি টাকার জমিঃ
ইস্টার্ন হাউজিংয়ের আগুন্ডা-২১ মৌজায় মোট ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশের দুটি প্লট এবং মিরপুর বেড়িবাঁধসংলগ্ন গড়ান চটবাড়ি মৌজায় ৩৩ শতাংশের আরেকটি জমির তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদনে আগুন্ডার জমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ২০ কোটি এবং বেড়িবাঁধসংলগ্ন জমিটির মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ–৬ | সাভারের মধুমতি মডেল টাউনে বাংলো ও শত শত কাঠা জমি রয়েছে।
শহিদুল ইসলামের সম্পদের তালিকায় সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের নামও এসেছে। সেখানে প্রায় ৩৫ কাঠা জমির ওপর ‘সেঁজুতি’ নামে একটি বাংলোবাড়ির কথা প্রকাশিত হয়েছে। শুধু জমিটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
একই এলাকায় আরও পাঁচটি প্লটে মোট প্রায় ৩২০ কাঠা জমি থাকার দাবি করেছে এশিয়া পোস্ট। প্রতিবেদনের বাজারমূল্যের হিসাব অনুযায়ী এগুলোর মূল্য অন্তত ৯০ কোটি টাকা হতে পারে।

অভিযোগ–৭ | পূর্বাচলে একের পর এক মূল্যবান প্লট
পূর্বাচল ও এর আশপাশের বিভিন্ন মৌজায় শহিদুল ও তার স্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয়টি প্লটের তথ্য প্রকাশ করেছে এশিয়া পোস্ট। প্রতিবেদনে পিংক সিটি–দুমনি, পিতলগঞ্জ, দীঘালিয়া, বারিয়াছানি, মুশুরিগ্রাম ও কামতা মৌজার জমির কথা উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবেদনের নিজস্ব বাজারমূল্য হিসাব অনুযায়ী, এসব জমির সম্মিলিত মূল্য ৬০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। একই প্রতিবেদনে গাজীপুরের কালীগঞ্জে ১৫ শতাংশের আরেকটি প্লটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ–৮ | স্ত্রীর নামে শেয়ারবাজারে প্রায় ৮০ কোটি টাকা
স্থাবর সম্পত্তির পাশাপাশি বিপুল অঙ্কের আর্থিক বিনিয়োগের অভিযোগও সামনে এসেছে।
এশিয়া পোস্ট দাবি করেছে, স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির একটি বিও হিসাবে শেয়ারবাজারে প্রায় ৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। একই প্রতিবেদনে একটি সোনালী ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা থাকার দাবিও করা হয়েছে।
অভিযোগ–৯ | ছেলের ব্যবসায় কোটি টাকার অর্থায়ন
শহিদুলের ছেলে হাসিন ফারহানের ব্যবসায় বড় অঙ্কের অর্থায়নের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বসুন্ধরার জেসিএক্স বিজনেস টাওয়ারে ভেলোসিটি গ্রুপের অধীনে একাধিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এর নাম উল্লেখ করে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠায় শহিদুল অন্তত পাঁচ কোটি টাকা দিয়েছেন।

অভিযোগ–১০ | সরকারি চাকরির আয় বনাম সম্পদের পরিমাণ নিয়ে বড় প্রশ্নঃ
শহিদুল ইসলামের সম্পদের উৎস নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে তার সরকারি চাকরিজীবনের সম্ভাব্য বৈধ আয়ের সঙ্গে প্রকাশিত সম্পদের পরিমাণের তুলনায়। এশিয়া পোস্ট কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তার বক্তব্যের ভিত্তিতে একটি আনুমানিক হিসাব প্রকাশ করেছে। তাদের হিসাবে দীর্ঘ সরকারি চাকরি, বিদেশি দায়িত্ব ও অবসরকালীন সুবিধা মিলিয়েও একজন কর্মকর্তার সম্ভাব্য সঞ্চয় প্রকাশিত সম্পদের তুলনায় অনেক কম হওয়ার কথা

অভিযোগ–১১ | প্রভাবশালী সব পদে ছিলেন শহিদুলঃ
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী শহিদুল ইসলাম কর্মজীবনে এনবিআরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সদস্য, কাস্টমস-এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং ঢাকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছে এশিয়া পোস্ট।
প্রতিবেদনটির দাবি, অনুসন্ধানে পাওয়া সম্পত্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ২০১০ সালের পর অর্জিত।

অভিযোগ–১২ | দেশে-বিদেশে সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগঃ
বাংলাদেশের বাইরে সম্পদ ও অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগও শহিদুলকে ঘিরে প্রকাশিত হয়েছে। ‘আমার বার্তা’র একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাইয়ে অর্থ পাচারের অভিযোগ তোলা হয় এবং শহিদুল স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে নিয়ে মালয়েশিয়ায় চলে গেছেন বলে দাবি করা হয়।

অভিযোগ–১৩ | গ্রামের বাড়ি ও রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে যেসব দাবিঃ
শহিদুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ এলাকায় বলে ‘আমার বার্তা’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বাবার নামে ‘মোশারফ হোসেন ডিগ্রি কলেজ’ প্রতিষ্ঠার কথাও প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজ এলাকায় তুলনামূলক কম দৃশ্যমান সম্পদ রেখে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
তাকে ঘিরে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, শেখ হেলালের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নেওয়ার প্রস্তুতির মতো দাবিও বিভিন্ন সূত্রে আলোচিত হয়েছে।

অভিযোগ–১৪ | ভাই ও আত্মীয়দের ব্যবসা নিয়েও প্রশ্নঃ
শহিদুলের ভাই সেলিম আহমেদ এর রয়েছে সেলিম এন্টারপ্রাইজ নামক সি&এফ ফার্ম। তার অন্য ভাই সামিম আহমেদের রয়েছে ইউনিক পলি ইন্ডাঃ লি, আইডিয়াল পলিমার সহ একাধিক গার্মেন্টস একসেসরিজ কারখানা। তার ভাইদের বিভিন্ন ব্যবসা এবং সেসব ব্যবসার মূলধনের উৎস নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের তদন্তের আহ্বানঃ
এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়। তিনি সম্পদের উৎস রাষ্ট্রীয়ভাবে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

শহিদুল ও পরিবারের বক্তব্যঃ
অভিযোগগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য। এশিয়া পোস্ট জানিয়েছে, শহিদুল ইসলামের একাধিক নম্বরে ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন করার পর তিনি আর কথা বলেননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।