
আরিফ রহমান :: বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় স্বার্থে এক থাকার কোনো বিকল্প নেই।
জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার এই তাগিদ আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর নানা সময়ের বিবৃতির মধ্যে দেখতে পাই। একে কেবল তাদের বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর বাস্তবায়নের পথ দেখাতে হবে। নিজেদের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থসংবলিত বিষয়াবলি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা জরুরি। এর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর জনগণের প্রত্যাশা পূরণে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করা প্রয়োজন। কেননা বিগত সময়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার পরিণতি ছিল গণবিচ্ছিন্নতা ও আস্থাহীনতা। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের জনগণ সেই অর্থে কখনোই ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল না।
গণবিচ্ছিন্নতা নয়, বরং গণসম্পৃক্ততার ওপর অধিক জোর দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের সব উন্নয়ন–পরিকল্পনা গণমানুষের চাহিদাকে কেন্দ্রে রেখে বাস্তবায়ন করার দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। বছরের পর বছর ধরে আমাদের যতটা উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, তার সুফল খুব একটা দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর দ্বারপ্রান্তে আমরা পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছি। সব সময় তথাকথিত উন্নয়নের সুফল কেবল একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর হাতের নাগালে ছিল। তাই আমাদের জন্য গণমানুষকেন্দ্রিক একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। যার অনেক অবকাঠামো ও চর্চা আমাদের দেশে অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান; কিন্তু সুশাসনের অভাবে তার সুফল আমাদের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী পাচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে মাও সে-তুংয়ের একটি উদ্ধৃতি বেশ প্রাসঙ্গিক, ‘উন্নয়ন মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়ে একটি সুন্দর জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে।’ সেই মুক্তির স্বাদের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের রূপরেখা জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাদের আস্থা অর্জন করা সহজ হবে।
এ বাস্তবতায় জাতীয় উন্নয়নের এমন একটি সমন্বিত রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনা গড়ে তুলতে হবে, যা আমাদের বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নকে প্রতিফলিত করবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের একটি ‘বাংলাদেশি ড্রিম’ বা স্বপ্ন গড়ে তুলতে হবে, যেখানে গণমানুষের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাবে; যা আমরা অনেক উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে দেখতে পাই, যারা তাদের উন্নয়নের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করে আজ বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা সব সময় দেখি যে উন্নয়ন–পরিকল্পনায় জাতিগত প্রত্যাশার চেয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একক বা একপক্ষীয় স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার তাগিদ দেখা যায়, যা বিশেষ করে বিগত দশকের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হবে।
তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে যদি ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা যায়, তা হবে এক অভূতপূর্ব বিষয়। এতে রাষ্ট্রীয় পরিসরে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও মৌলিক উন্নয়ন–আকাঙ্ক্ষা ও কাঠামোর কোনো বদল ঘটবে না। ফলে উন্নয়নপ্রক্রিয়া কোনো পরিস্থিতিতেই বাধাগ্রস্ত হবে না। যদিও এটি সহজ বিষয় নয়, আবার কঠিন বলে আমরা তা বাস্তবায়ন করতে পারব না ভেবে হাত গুটিয়ে বসে থাকাও উচিত হবে না।
মনে রাখা জরুরি যে সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া; তাই একটি স্বল্প সময়ে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় আমরা সব বিষয়ে একমত হতে পারব; সেই প্রত্যাশাও একটি উচ্চাভিলাষী আকাঙ্ক্ষা।
এর জন্য যেমন যথাযথ সময় প্রয়োজন, তেমনি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোরও সেই ইতিবাচক মানসিকতারও প্রয়োজন। পৃথিবীর কোনো দেশই সংস্কার প্রক্রিয়া এক দিনে বাস্তবায়িত করতে পারেনি। আমরা যদি প্রতিবেশী বন্ধু দেশ চীনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তাদের জাতীয় পরিসরে সংস্কার প্রক্রিয়া ও সংলাপ জারি রেখেছে। তাদের সেই সংস্কার ছিল অগ্রাধিকার ও খাত ভিত্তিক।
একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয় ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সংস্কার যোগ্য খাতকে চিহ্নিত করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় যখন সবার অংশগ্রহণ ও অংশীদারত্ব থাকে, তখনই তা বাস্তবায়ন করা বাস্তব সম্মত, ফল প্রসূ ও দীর্ঘ মেয়াদে স্থায়ী হয়।
বর্তমান এই সময়টায় দেশটাকে সত্যিকার অর্থেই বদলে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে এক অভাবনীয় সুযোগ তৈরি করেছে। তাদের উচিত হবে সেই বিষয় নিয়ে কাজ করা।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে জুলাই–পরবর্তী সময়ের রাজনীতি একটি ভিন্ন আঙ্গিকে পরিচালিত হবে, তেমন এক প্রত্যাশা জাতির মনে তৈরি হয়েছে। কারণ, চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে একটি বৈপ্লবিক ও ঐতিহাসিক বদল নিয়ে আসার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।
এ সুযোগকে যথাযথভাবে নিতে চাইলে প্রথমেই রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় স্বার্থে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে, যে প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক; কিন্তু জাতীয় প্রশ্নে আবার একটি ঐকমত্যে পৌঁছানোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা ও তার চর্চার অভ্যাসও জরুরি। মতপার্থক্যের মধ্য দিয়েই আমরা একটি বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছাতে পারব। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় স্বার্থে এক থাকার কোনো বিকল্প নেই।
● আরিফ রহমান, লেখক ও গবেষক।

