ঢাকামঙ্গলবার , ১৯ মে ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

প্রবাসীর ৮ টুকরা মরদেহ উদ্ধার, উঠে এলো লোমহর্ষক তথ্য

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
মে ১৯, ২০২৬ ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৩৫

নিজস্ব প্রতিবেদক  :: রাজধানীর মুগদার মান্ডা এলাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৌদি প্রবাসী মোকাররমকে হত্যার পর মরদেহ আট টুকরো করে পলিথিনে ভরে বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখার ঘটনায় এক লোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে র‍্যাব। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি হেলেনা বেগম (৪০) ও তার ১৩ বছর বয়সী মেজো মেয়েকে নরসিংদী সদর উপজেলার নন্দরামপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৩। তবে ঘটনার মূল হোতা ও পরকীয়া প্রেমিকা তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনা (৩১) এখনো পলাতক রয়েছেন।

সোমবার (১৮ মে) বিকেলে রাজধানীর শাহজাহানপুরে র‍্যাব-৩ সদরদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, হত্যাকাণ্ডের পর মোকাররমের মরদেহ আট টুকরো করে ঘাতকরা। এর মধ্যে সাত টুকরো ভাড়াবাসার নিচে ময়লার স্তূপে এবং মাথার অংশটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ফেলে দেওয়া হয়। আরও প্যান্ট শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, এই নৃশংস ঘটনার পরদিন অভিযুক্ত হেলেনা বেগম, তার মেয়ে ও পলাতক তাসলিমা বাইরে ঘুরতে গিয়ে হোটেলে বিরিয়ানি খান এবং রাতে বাসায় ফিরে প্রতিবেশীদের ডেকে ছাদে উৎসব বা পার্টি করেন।

র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা মোকাররমের সাথে একই গ্রামের বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী সুমনের সুসম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনার সাথে মোকাররমের পরিচয় ও পরে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রবাসে থাকাকালীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগের পাশাপাশি প্রেমিকা তাসলিমাকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা দেন মোকাররম। গত ১৩ মে নিজের বাড়িতে কোনো কিছু না জানিয়ে মোকাররম বাংলাদেশে নেমে সরাসরি চলে যান মুগদার মান্ডা এলাকায় তাসলিমার বান্ধবী হেলেনা আক্তারের ভাড়া বাসায়। এক রুমের সেই বাসায় তাসলিমা, মোকাররম, হেলেনা এবং তার দুই মেয়ে একসাথে অবস্থান করছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ হিসেবে র‍্যাব জানায়, ১৩ মে রাতে মোকাররম ও তাসলিমার মধ্যে তীব্র মনোমালিন্য শুরু হয়। একপর্যায়ে হেলেনার ১৩ বছর বয়সী মেয়ের সাথে মোকাররম অসামাজিক কার্যকলাপের চেষ্টা করলে হেলেনা তা দেখে ফেলেন। এই নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলে ওই রাতেই তাসলিমা ও মোকাররমের বিয়ে নিয়ে বাগবিতণ্ডা হয়। মোকাররম বিয়ে করতে চাইলেও তাসলিমা রাজি হননি, যার ফলে মোকাররম তার দেওয়া পাঁচ লাখ টাকা ফেরত চান এবং তাসলিমার ব্যক্তিগত আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।

এই বিরোধের জেরে হেলেনাকে সাথে নিয়ে মোকাররমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তাসলিমা। মেয়ের ওপর ক্ষোভ থেকে হেলেনাও এতে রাজি হন। পরিকল্পনা মোতাবেক ১৪ মে সকালে নাশতার সাথে মোকাররমকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। মোকাররম ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে হেলেনা তাকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন। প্রাণ বাঁচাতে মোকাররম হেলেনার হাতে কামড় দিলে তাসলিমা হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করেন। মোকাররম হাতুড়ি ছিনিয়ে নিয়ে উল্টো তাসলিমাকে আঘাত করতে গেলে পরিস্থিতি আরও সংঘাতময় রূপ নেয়।

ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে হেলেনা বঁটি দিয়ে মোকাররমের গলায় কোপ দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন এবং তার মেজো মেয়ে হাতুড়ি দিয়ে মোকাররমের মাথায় আঘাত করে। পরে তাসলিমা ধারালো বঁটি দিয়ে আরও তিন-চারবার আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। সবাই মিলে বাথরুমে মরদেহ নিয়ে রক্তমাখা ঘর পরিষ্কার করেন এবং বাইরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসে মোকাররমের মরদেহ আট টুকরো করে বস্তায় ভরে রাখেন। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ১৪ মে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সুযোগ বুঝে মরদেহের সাত টুকরো নিচে ময়লার স্তূপে এবং মাথার অংশটি এক কিলোমিটার দূরে ফেলে দেওয়া হয়।

হত্যাকাণ্ড ও ছাদ পার্টির পর ১৬ মে তাসলিমা তার ছোট ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যান এবং ১৭ মে হেলেনা তার দুই মেয়েকে নিয়ে কাজে যোগ দেন। তবে ১৭ মে দুপুরে মরদেহ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ালে এলাকাবাসী ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহের টুকরোগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় এবং ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র শনাক্ত করে মোকাররমের পরিচয় নিশ্চিত করে।

ঘটনাটি নজরে আসার পর র‍্যাব-৩ গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত হেলেনা আক্তার ও তার মেজো মেয়েকে গ্রেপ্তার করে। হেলেনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে মোকাররমের মাথার অংশটি উদ্ধার করা হয়। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত অন্য আসামি তাসলিমাকে গ্রেপ্তারে র‍্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।