শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:২৪ অপরাহ্ন

বরিশালে মুজিববর্ষ পালনের জন্য সভার নামে বাধ্যতামুলক নিজের লেখা দেড়লাখ টাকার বই বিক্রি

বরিশালে মুজিববর্ষ পালনের জন্য সভার নামে বাধ্যতামুলক নিজের লেখা দেড়লাখ টাকার বই বিক্রি

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী “মুজিববর্ষ” পালনকে সামনে রেখে জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার দেড়শ’ স্কুল, কলেজ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিদের ডেকে সভার নামে ইউএনও তার নিজের লেখা দেড় লাখ টাকার বই বাধ্যতামুলক বিক্রি করেছেন বলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা অভিযোগ করেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার শহীদ সুকান্ত আব্দুল্লাহ হলররুমে উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধুরী রওশন ইসলামের সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সাথে মুজিববর্ষ পালনের জন্য প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রইচ সেরনিয়াবাত, সরকারী শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুনীল কুমার বাড়ৈ ও সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ মোঃ লিটন, থানার ওসি, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারসহ সরকারী কর্মকর্তা ও উপজেলার ১৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানশিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিগণ। অনুষ্ঠিত সভা শেষে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার পর ইউএনও তার নিজের লেখা দুটি বই ক্রয় করতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নির্দেশ প্রদান করেন।

উপজেলার ৩৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দুইটি কলেজ, ছয়টি স্কুল এ্যান্ড কলেজ, ছয়টি মাদ্রাসা, একটি ভোকেশনাল স্কুল, ৯৭টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুইটি বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মোট ১৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ইউএনও চৌধুরী রওশন ইসলামের লেখা “প্রতিবিম্ব” ও “দৈনন্দিন গল্প” নামের পাঁচটি করে মোট ১০টি বই বাধ্যতামুলক কিনতে শিক্ষকদের বাধ্য করা হয়। “দৈনন্দিন গল্প” বইটির গায়ে মূল্য লেখা রয়েছে ১৫০টাকা ও “প্রতিবিম্ব” বইটির মূল্য লেখা রয়েছে ১৩০টাকা। সে হিসেবে ১০টি বইর মূল্য দাঁড়িয়েছে এক হাজার চারশ’ টাকা। তবে শিক্ষকদের কাছে বাধ্যতামুলক বিক্রি করা ১০টি বইয়ের মূল্য রাখা হয়েছে এক হাজার টাকা করে। সে হিসেবে ১৫০টি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের দেড় লাখ টাকার বই কিনতে বাধ্য করেছেন ইউএনও।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বই কিনতে বাধ্য হওয়া একাধিক শিক্ষকরা বলেন, তারা একহাজার টাকা দিয়ে বই কেনার জন্য কেউ প্রস্তুতি নিয়ে সভায় আসেননি। ইউএনও’র নির্দেশনায় মানসম্মান আর চাকরীর ভয়ে সহকর্মী, পরিচিতজনদের কাছ থেকে ধার দেনা করে তারা বই নিতে বাধ্য হয়েছেন। ওইদিন যারা নিতে পারেননি তাদের পরবর্তিতে নিতে হবে বলে ইউএনও নির্দেশ দিয়েছেন। তারা আরও বলেন, জাতির পিতার শতবর্ষ উদ্যাপনের জন্য ডাকা সভায় ইউএনও তার নিজের লেখা বই কিনতে বাধ্য করবেন তা তারা জানতেন না।

শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, ঘটা করে শিক্ষকদের ডেকে তিনি (ইউএনও) নিজেকে কি প্রমান করতে চেয়েছেন তা তাদের বোধগম্য নয়। স্ব-স্ব শিক্ষা বিভাগের মাধ্যমেও মুজিববর্ষ পালনের নির্দেশনা দেয়া যেতো বলেও তারা মন্তব্য করেন। তারা আরও অভিযোগ করেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ি সরকারী সকল অফিস ও অডিটরিয়ামে জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি টানানো বাধ্যতামুলক। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবীর মুল্যায়ন করে মন্ত্রী আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর প্রচেষ্টায় আগৈলঝাড়ায় কোটি টাকা ব্যয়ে “শহীদ সুকান্ত আব্দুল্লাহ” অডিটরিয়াম নির্মিত হলেও সেই অডিটরিয়ামে বছর ঘুরেও ঠাঁই হয়নি জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর কোন ছবি। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে জাতির পিতার সাথে শহীদ হওয়া সুকান্ত আব্দুল্লাহর নামে অডিটরিয়ামের নাম করণ করা হলেও সেখানে ঠাঁই মেলেনি শহীদ সুকান্ত আব্দুল্লাহর কোন ছবি! সেদিকে ইউএনও’র কোন খেয়াল না থাকলেও তিনি (ইউএনও) মুজিববর্ষ পালনের নামে প্রস্তুতি সভার নামে মূলক বাধ্যতামুলকভাবে বই বিক্রি করাই ছিলো মতবিনিময় সভা ডাকার মূল উদ্দেশ্য।

অডিটরিয়ামে জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি না থাকায় শিক্ষকদের সাথে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ স্বাধীনতার পক্ষের স্থানীয় সাধারণ জনগন। খোঁজনিয়ে জানা গেছে, ইউএনও চৌধুরী রওশন ইসলামের পূর্বের কর্মস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা অডিটরিয়ামেও তিনি জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি রাখা আবর্শক মনে করেননি। অভিযোগ রয়েছে, ইউএনও চৌধুরী রওশন ইসলামের লেখা একটি বই একুশের জাতীয় বই মেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়। তার লেখা ওই বই বিক্রির জন্য ইউএনও রওশন ইসলাম কৌশলে উপজেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাক্তিকে কৌশলে ম্যানেজ করে বই বিক্রির জন্য আগৈলঝাড়ায় এ বছর সরকারী খরচে বই মেলার আয়োজন করেন। প্রথমে একদিনের জন্য বই মেলা অনুষ্ঠিত হবার কথা থাকলেও ইউএনও’র লেখা বই আশাতীত বিক্রি না হওয়ায় সরকারী খরচে নিজের লেখা বই বিক্রির জন্য মেলা বর্ধিত করে তিনদিন করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলার একাধিক কর্মকর্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয় ১২ ফ্রেব্রুয়ারী। অনুষ্ঠিত প্রস্তুতি সভায় আগৈলঝাড়ায় বই মেলা সম্পর্কে ইউএনও কোন কথাই উত্থাপন করেননি। কৌশলী ইউএনও ১৬ ফেব্রুয়ারী রাতে স্থানীয় এমপি’র বাসভবনে সরকারী উন্নয়ন কাজের জন্য তার সাথে দেখা করতে গিয়ে আকস্মিকভাবে এমপিকে বলে কৌশলে বই মেলা করার অনুমতি নিয়ে নেন। নিজের লেখা বই বিক্রির জন্য ঘটা করে সরকারী খরচে আয়োজন করেন বই মেলার।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধুরী রওশন ইসলাম শিক্ষকদের কাছে বাধ্যতামুলক বই বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি শিক্ষকদের বলেছেন তার লেখা বই যদি কেউ কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেন তবে তারা নিতে পারেন। তিনি আরও বলেন, শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক তার লেখা ৬/৭শ বই চেয়ে নিয়েছেন বিক্রি করে দেয়ার জন্য। তাদের বই দেয়ার জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসে বই সরবরাহ করা হয়েছে। যদি কোন শিক্ষককে বই কিনতে বাধ্য করা হয় সেটা করেছেন শিক্ষক সমিতির নেতারা। অডিটরিয়ামে জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি না রাখার ব্যাপারে তিনি বলেন, ছবি না টানানোর কারনে উচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করা হয়নি। ছবি টানানোর বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে।

শিক্ষক সমিতির সভাপতির ওপর ইউএনও’র বাধ্যতামুলক বই বিক্রির দায় চাঁপানোর বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি সুনীল কুমার বাড়ৈ বলেন, ইউএনও তার লেখা বই যাদের পছন্দ হয় তাদের সংগ্রহ করতে বলেছিলেন। তার কথানুযায়ি শিক্ষকদের বই সংগ্রহ করতে বলা হয়েছিল। মাধ্যমিক স্তরের কোন শিক্ষককে বই কিনতে বাধ্য করা হয়নি। প্রাথমিক স্তরে কি হয়েছে তা তিনি জানেন না জানিয়ে অডিটরিয়ামে জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি না থাকার বিষয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2019 ajkercrimetimes.com

Design and Developed By Sarjan Faraby