
মো: আম্মার হোসেন আম্মান :: বরিশালে সরকারি মহিলা পলিটেকনিকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু, দক্ষিণাঞ্চলে নারী কারিগরি শিক্ষার নতুন দিগন্ত।
দক্ষিণাঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে বরিশাল সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ৪৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে রোববার (১১ অক্টোবর) প্রতিষ্ঠানটিতে শুরু হয়েছে প্রথম দিনের ক্লাস। আর্কিটেকচার টেকনোলজি এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি—এই দুটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি নারীদের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চলে নারীদের জন্য বিশেষায়িত সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা এ অঞ্চলের কারিগরি শিক্ষার প্রসারে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। দীর্ঘদিনের নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রমের পর শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে নতুন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রথম দিনের ক্লাসকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে উৎসাহ-উদ্দীপনা।
দুটি বিভাগে ৪৭ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা
২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে আর্কিটেকচার টেকনোলজি এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি ও পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দুটি বিভাগে মোট ৪৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক কার্যক্রমের সূচনা হয়।
প্রতিষ্ঠানটিতে অধ্যক্ষ, ইন্সট্রাক্টর, সহকারী ইন্সট্রাক্টর ও ক্রাফট ইন্সট্রাক্টরসহ মোট ১১ জন শিক্ষক-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের উপাধ্যক্ষ এস. এম. সামচুন নাহার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রাথমিকভাবে দুটি বিভাগ চালু হলেও পর্যায়ক্রমে আরও বিভাগ খোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও বেশি নারী শিক্ষার্থীর কারিগরি শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
আলেকান্দায় আধুনিক অবকাঠামোয় গড়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠান
বরিশাল নগরীর আলেকান্দার ঐতিহাসিক পরেশ সাগর মাঠের প্রবেশদ্বারের উত্তর পাশে স্থাপন করা হয়েছে সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় ৩ একর ১৮ শতাংশ জমির ওপর গড়ে ওঠা এই প্রকল্পে নির্মাণ করা হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী একাধিক বহুতল ভবন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ছয়তলাবিশিষ্ট একটি প্রশাসনিক ভবন, উত্তর পাশে ছয়তলাবিশিষ্ট একটি একাডেমিক ভবন এবং দক্ষিণ পাশে ছয়তলাবিশিষ্ট আরেকটি একাডেমিক ওয়ার্কশপ ভবন। ভবনগুলোতে লিফটের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য চারতলাবিশিষ্ট ২০০ আসনের ছাত্রীনিবাস, শিক্ষকদের জন্য পাঁচতলাবিশিষ্ট ২০ ইউনিটের ডরমেটরি এবং কর্মচারীদের জন্য তিনতলাবিশিষ্ট ছয় ইউনিটের স্টাফ কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে একতলাবিশিষ্ট অধ্যক্ষের বাসভবন, নিজস্ব বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ও অভ্যন্তরীণ সড়কব্যবস্থা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির এসব অবকাঠামো শিক্ষার্থীদের আবাসন, পাঠদান ও ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিসেম্বরের মধ্যে অসমাপ্ত কাজ শেষ করার আশা
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম।
তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় ছয়টি বহুতল ভবন, একটি একতলা ভবন, শহীদ মিনার, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, অভ্যন্তরীণ সড়ক, ড্রেন, দুটি আধুনিক প্রবেশগেট এবং বাউন্ডারি ওয়ালসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।
বর্তমানে একাডেমিক ওয়ার্কশপ, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ও শহীদ মিনার নির্মাণের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এসব অসমাপ্ত কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস. এম. সামচুন নাহার জানান, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানে পৌঁছেছে। ফলে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের চোখে নতুন স্বপ্ন
প্রতিষ্ঠানটির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ, নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তোলার প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে নানা স্বপ্ন।
আর্কিটেকচার টেকনোলজি বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী বুশরা আক্তারের বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলায়। রোববার নতুন প্রতিষ্ঠানে প্রথম ক্লাস করার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বরিশালের প্রথম মহিলা পলিটেকনিকের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী হতে পেরে আমি গর্বিত। মনোরম পরিবেশ ও শিক্ষকমণ্ডলীর আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমার জীবনের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো।’
তার এই অনুভূতিতে উঠে এসেছে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পথচলা শুরুর আনন্দ ও ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলার পাশাপাশি কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
একইভাবে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেমা বিনতে মরিয়মও প্রথম দিনের ক্লাস নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘এ ইনস্টিটিউটে প্রবেশে আমার মনে অন্য রকম এক আনন্দ-উচ্ছ্বাস অনুভব হচ্ছে। নতুন প্রতিষ্ঠানে, নতুন ক্লাসে, প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষকদের আন্তরিকতা আমাকে উজ্জীবিত করেছে।’
শিক্ষার্থীদের এমন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া নতুন প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক পরিবেশ সম্পর্কে আশাবাদ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মানসম্মত পাঠদান, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি নারী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব
সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা এস. এম. সামচুন নাহার বলেন, বর্তমান সরকার নারী শিক্ষার প্রসার এবং নতুন প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে চায়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই এ প্রতিষ্ঠানে প্রথম বর্ষে দুটি বিভাগ চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও বিভাগ চালু করা হবে।
তিনি বলেন, এ প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন। এতে তারা নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও স্বাবলম্বী করে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
তার মতে, কারিগরি শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া। এ ধরনের শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীকে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার পথও তৈরি করতে পারে।
দক্ষিণাঞ্চলে কারিগরি শিক্ষার নতুন সম্ভাবনা
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট দক্ষিণাঞ্চলের প্রথম এ ধরনের প্রতিষ্ঠান। ফলে বরিশালসহ আশপাশের জেলার নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে আর্কিটেকচার টেকনোলজি ও কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মতো প্রযুক্তিনির্ভর বিভাগে পড়াশোনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে বিভিন্ন পেশায় নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে নিয়মিত পাঠদান, পর্যাপ্ত ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক ল্যাব ও ওয়ার্কশপের কার্যকর ব্যবহার এবং দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
প্রতিষ্ঠানটির পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো ও একাডেমিক কার্যক্রম চালু হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণের পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
সব মিলিয়ে, ৪৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বরিশাল সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রথম ক্লাস শুরু হওয়া কেবল একটি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা নয়; বরং দক্ষিণাঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার নতুন সম্ভাবনার সূচনা। যথাযথ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি নারীর ক্ষমতায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

