
নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশাল বিভাগের প্রায় এক কোটি মানুষের চোখের চিকিৎসার প্রধান সরকারি ভরসা শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অথচ বিভাগজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নতুন করে ছানি রোগে আক্রান্ত হলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে নেই পর্যাপ্ত চক্ষু বিশেষজ্ঞ। ফলে চোখের সামান্য সমস্যা নিয়েও রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বিভাগীয় শহরের এই হাসপাতালে। এতে চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়ছে যাতায়াত ব্যয় ও ভোগান্তি। অন্যদিকে, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পেরে নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ বাধ্য হচ্ছেন ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হতে। ফলে চোখের চিকিৎসায় সরকারি সেবার বিকেন্দ্রীকরণ না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রান্তিক ও অসচ্ছল রোগীরা।
শুধু বরিশাল শহর নয়, বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী আসছেন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দীর্ঘ অপেক্ষা, রোগীর চাপ আর চিকিৎসক সংকটের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ৭০ বছর বয়সের জাহাঙ্গীর হাওলাদার জানান, কিছুদিন ধরে চোখে ঝাপসা দেখছিলেন তিনি। প্রথমে বিষয়টিকে বয়সজনিত স্বাভাবিক সমস্যা মনে করলেও ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি কমে আসায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। পরে জানতে পারেন, তার চোখে ছানি পড়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়বহুল হবে যেনে কম খরচে এ সমস্যার চিকিৎসা নিতেই এসেছেন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
‘জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে একাধিক চক্ষু বিশেষজ্ঞ পদায়ন করা গেলে স্থানীয় পর্যায়েই মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাবেন। এতে জেলার রোগীদের চিকিৎসার জন্য বরিশাল শহরে ছুটে আসার প্রবণতাও কমবে।’
হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায়, জাহাঙ্গীর হাওলাদারের মতো অনেক রোগী দূরদূরান্ত থেকে চোখের চিকিৎসা নিতে এসেছেন। সরকারি পর্যায়ে বিকল্প বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকায় একই হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ। অথচ হাসপাতালে রয়েছে চিকিৎসকের সংকট।
হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চক্ষু বিভাগে একজন রেজিস্টার, একজন সহকারী রেজিস্ট্রার ও চার জন আইএমও থাকার কথা। অথচ এই ৬ পদের বিপরীতে রয়েছে মাত্র ২ জন চিকিৎসক। একজন সহকারী রেজিস্ট্রার ও একজন আইএমও। ফলে একজন রেজিস্টার ও ৩ জন আইএমও ছাড়াই চলছে এ হাসপাতালের চোখের চিকিৎসা সেবা।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন বলেন, শের-ই-বাংলা মেডিকেল ছাড়া সরকারি পর্যায়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায় না। আর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে তো খরচ অনেক। তাই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগীদের একটি বড় অংশ বেসরকারি হাসপাতালের দিকে ঝুঁকছেন। এ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।’
আরেক রোগীর স্বজন বলেন, দূরবর্তী এলাকা থেকে আসতে যাতায়াতেই অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকলে কম খরচে নিজ এলাকাতেই চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হতো।
পটুয়াখালী থেকে আসা এক যুবকও একই ধরনের সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, স্থানীয় হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকলে এত দূর আসতে হতো না।
এদিকে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, বরিশাল বিভাগে প্রতিবছর অন্তত ৩০ হাজার মানুষ ছানি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অথচ শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া বিভাগের অন্য কোনো সরকারি হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসার চাপ সামলাতে হচ্ছে এই একটি প্রতিষ্ঠানকে।
চিকিৎসকদের মতে, সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চক্ষু বিশেষজ্ঞ না থাকায় অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন। এতে বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল ছাড়া সরকারি পর্যায়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায় না। আর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে তো খরচ অনেক। তাই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
বেসরকারি হাসপাতালে চোখের চিকিৎসা নেওয়া সাব্বির আহমেদ বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট ও দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। সেখানে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া গেলেও ব্যয় অনেক বেশি। সরকারি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে দরিদ্র রোগীদের জন্য তা বড় স্বস্তি হতো।
চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. ডিবি পাল বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগীদের একটি বড় অংশ বেসরকারি হাসপাতালের দিকে ঝুঁকছেন। এ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ছানি রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতে চক্ষু বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সেবার পরিধি বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় একটি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল থেকে যাবে পুরো বিভাগের কোটি মানুষের চোখের চিকিৎসা।
তবে চক্ষু চিকিৎসার এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি কাজ করছে বেসরকারি সংস্থাও।
দ্য ফ্রেড হলোজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ কে এম বদরুল হক বলেন, বরিশাল বিভাগকে ২০৩০ সালের মধ্যে ছানিমুক্ত করার লক্ষ্যে প্রান্তিক পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় বিদ্যমান চিকিৎসক সংকট কাটাতে শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (বরিশাল) ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার।
তিনি বলেন, জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে একাধিক চক্ষু বিশেষজ্ঞ পদায়ন করা গেলে স্থানীয় পর্যায়েই মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাবেন। এতে জেলার রোগীদের চিকিৎসার জন্য বরিশাল শহরে ছুটে আসার প্রবণতাও কমবে।

