ঢাকাSaturday , 29 August 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশাল বিমানবন্দরে অচলাবস্থা আধুনিক অবকাঠামো থাকলেও ফ্লাইট সপ্তাহে ৩ দিন

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৮৪

নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশাল বিমানবন্দরে অচলাবস্থা! আধুনিক অবকাঠামো থাকলেও ফ্লাইট সপ্তাহে মাত্র তিন দিন।

আধুনিকায়নের নানা উদ্যোগ ও অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়লেও বরিশাল বিমানবন্দরে নিয়মিত ফ্লাইটের সংকট কাটছে না। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সপ্তাহে মাত্র তিন দিন ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও রোববারের এই সীমিত ফ্লাইটের কারণে জরুরি প্রয়োজনে রাজধানীতে যাতায়াতকারী দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে অনেক সময় সড়ক ও নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমানবন্দরের অবকাঠামো ও যাত্রীসেবার মান উন্নত হলেও পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকায় ফ্লাইট বাড়াতে এয়ারলাইন্সগুলোর আগ্রহ কম। বর্তমানে ৭৪ আসনের ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ উড়োজাহাজে প্রতি ফ্লাইটে গড়ে ২০ থেকে ২২ জন যাত্রী থাকছেন। ফলে পরিচালন ব্যয় তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। যাত্রীসংখ্যা কম থাকায় ভাড়াও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামানো সম্ভব হচ্ছে না।

 

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-বরিশাল রুটে বাংলাদেশ বিমানের ভাড়া প্রায় ৪ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত। এতে নিয়মিত যাতায়াতকারীদের অনেকের কাছেই বিমান ভ্রমণ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

 

একসময় ঢাকা-বরিশাল রুটে একাধিক বেসরকারি এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইট ছিল। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও নভোএয়ারও এ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। তবে পদ্মা সেতু চালুর পর সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় আকাশপথে যাত্রী কমতে থাকে। পরবর্তী সময়ে যাত্রী সংকটের কারণে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো এ রুট থেকে সরে যায় অথবা ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দেয়।

 

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা সেতু চালুর পর সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হলেও বরিশাল থেকে ঢাকায় আকাশপথের প্রয়োজনীয়তা কমেনি। বিশেষ করে চিকিৎসা, ব্যবসা, সরকারি-বেসরকারি চাকরি ও জরুরি প্রয়োজনে রাজধানীতে যাতায়াতকারীদের কাছে বিমান এখনো গুরুত্বপূর্ণ। সড়কপথে দীর্ঘ সময়ের যাত্রার তুলনায় আকাশপথে অল্প সময়ে ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব হওয়ায় নিয়মিত ফ্লাইটের চাহিদা রয়েছে।

 

উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু ফ্লাইট সংকট কাটছে না
বরিশাল বিমানবন্দর বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর এলাকায় অবস্থিত। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০-৯১ সালে বিমানবন্দরটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য এটি চালু করা হয়।

 

বর্তমানে বিমানবন্দরটির রানওয়ে ৬ হাজার ফুট দীর্ঘ ও ১০০ ফুট প্রশস্ত। সিএএবির উন্নয়ন পরিকল্পনায় রানওয়ে ৮ হাজার ৫০০ ফুটে সম্প্রসারণের পাশাপাশি এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং (এজিএল), ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম (আইএলএস), ডিভিওআর, ডিএমই ও পিএপিআই লাইট স্থাপন, কনভেয়ার বেল্ট ও এপ্রোন সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজের পরিকল্পনা রয়েছে।

 

বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক সঞ্জয় কুমার রায় বলেন, বিমানবন্দরের বিভিন্ন উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

নিরাপত্তা ও নেভিগেশন ব্যবস্থায় উদ্বেগ
অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও কিছু কারিগরি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের সুপারভাইজার মনমথো সরকার বলেন, সীমানাপ্রাচীরের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি স্থানে বাইরে থেকে সহজেই ভেতরে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনার নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া উড়োজাহাজ অবতরণের সময় রানওয়ের অবস্থান ও গ্লাইডপাথ নির্দেশনায় ব্যবহৃত পিএপিআই লাইটের কিছু অংশ নষ্ট রয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে সিএএবির উন্নয়ন পরিকল্পনায় নতুন পিএপিআই লাইট স্থাপনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ফ্লাইটের দাবি
বরিশাল-ঢাকা রুটে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ফ্লাইট পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন যাত্রী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, শুধু ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; সময়সূচি যাত্রীবান্ধব করা এবং ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে রাখাও জরুরি। একই সঙ্গে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোকে পুনরায় এ রুটে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

 

নিয়মিত যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী মো. আতিকুর রহমান বলেন, ব্যবসায়িক কাজে তাকে নিয়মিত ঢাকায় যেতে হয়। কিন্তু ফ্লাইটের সংখ্যা কম থাকায় অনেক সময় আকাশপথে যাতায়াতের সুযোগ পাওয়া যায় না। ফ্লাইট বাড়ানোর পাশাপাশি সময়সূচি ও ভাড়া যাত্রীবান্ধব করা হলে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপকৃত হবেন।

 

বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব ওয়াহিদুল ইসলাম প্রিন্স বলেন, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে প্রায়ই রাজধানীতে যেতে হয়। সড়কপথ বা লঞ্চে যেতে অনেক সময় লাগে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বরিশাল-ঢাকা আকাশপথে দ্রুত ফ্লাইট বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

 

বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন বলেন, বরিশাল-ঢাকা আকাশপথে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে তারা কাজ করছেন। বরিশাল বিমানবন্দরকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিমানবন্দরটির সক্ষমতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বরিশাল বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে রূপ দেওয়ার বিষয়েও তারা কাজ করতে চান।

 

সংশ্লিষ্টদের মতে, বরিশাল বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নিয়মিত ফ্লাইট নিশ্চিত করা গেলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর আকাশপথের যোগাযোগ আরও কার্যকর হবে। এজন্য যাত্রী বাড়াতে ভাড়া ও সময়সূচিতে ভারসাম্য আনা, ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো এবং বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোকে পুনরায় এই রুটে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।