ঢাকাWednesday , 26 August 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

লাল শাপলার অপরূপ সৌন্দর্যে বদলে যাচ্ছে সাতলা বিলের পর্যটনচিত্র

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৭৩

মারুফ হোসেন মিথুন :: ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকজুড়ে ফুটে থাকা অসংখ্য লাল শাপলা যেন প্রকৃতির হাতে বিছানো এক বিশাল লাল গালিচা। পানির ওপর শাপলার পাতা আর ফুলের সারি, তার মাঝ দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা ছোট ছোট নৌকা, দূরে সাদা বক ও পানকৌড়ির বিচরণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য। কোলাহলমুক্ত শান্ত গ্রামীণ পরিবেশে এমন মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের দেখা মেলে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার উত্তর সাতলা গ্রামের সাতলা বিলে।

প্রতিবছর বর্ষার শেষভাগ থেকে শরৎ ও হেমন্তের শুরু পর্যন্ত সাতলা বিলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি লাল শাপলায় ছেয়ে যায়। সাধারণত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিলের পানিতে শাপলার আধিক্য দেখা যায়। ভোরের সূর্যের আলোয় লাল শাপলার পাপড়ি যখন পানির ওপর ফুটে ওঠে, তখন পুরো বিলটিই যেন রঙিন চাদরে ঢেকে যায়। এ কারণে স্থানীয়ভাবে পরিচিত সাতলা বিল এখন দেশজুড়ে ‘সাতলার লাল শাপলার বিল’ নামে পরিচিত একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য

সাতলার বিলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিশাল জলাভূমির বুকজুড়ে লাল শাপলার পাশাপাশি কোথাও কোথাও সাদা ও বেগুনি শাপলাও দেখা যায়। শাপলার ফাঁক দিয়ে নৌকা চলাচল এবং পানির ওপর পাখিদের অবাধ বিচরণ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

ভোরের দিকে বিলে গেলে দেখা যায়, শাপলার ওপর শিশিরবিন্দু, পানির ওপর সূর্যের কোমল আলো এবং চারপাশে পাখির কলকাকলি। নৌকায় চড়ে বিলের ভেতরে ঢুকে শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করা পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা। প্রকৃতিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীদের কাছেও সাতলার বিল দীর্ঘদিন ধরে একটি পছন্দের গন্তব্য।

পর্যটকদের আনাগোনায় মুখর এলাকা

স্থানীয় বাসিন্দারা যুগের পর যুগ বিলের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে এলেও গত কয়েক বছরে সাতলার লাল শাপলা বিলের পরিচিতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। শাপলা ফোটার মৌসুম শুরু হলেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখানে ছুটে আসেন।

বিশেষ করে ছুটির দিন ও সাপ্তাহিক বন্ধের সময়ে পর্যটকদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে বিলসংলগ্ন এলাকা। কেউ পরিবার নিয়ে আসেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার অনেকে দলবদ্ধভাবে ঘুরতে আসেন। মোবাইল ফোন ও ক্যামেরায় শাপলার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতেও দেখা যায় দর্শনার্থীদের।

পর্যটনকে ঘিরে বাড়ছে স্থানীয় কর্মসংস্থান

পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিলের ওপর নৌকা চালিয়ে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা আয় করছেন। পাশাপাশি খাবারের দোকান, চা-পান ও হালকা নাশতার দোকান, স্থানীয় পরিবহনসহ বিভিন্ন ছোট ব্যবসার প্রসার ঘটছে।

স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে পর্যটন সুবিধা বাড়ানো গেলে সাতলা বিলকে কেন্দ্র করে আরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এলাকার কৃষি ও স্থানীয় পণ্যের বাজারও পর্যটকদের মাধ্যমে সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পর্যটকবান্ধব করতে অবকাঠামো উন্নয়ন

সাতলা বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের দীর্ঘদিনের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে উজিরপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিলের প্রবেশমুখে নান্দনিক গেট, পর্যটকদের জন্য আধুনিক ভিউ পয়েন্ট এবং নৌকায় ওঠানামার সুবিধার্থে ঘাটলা নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া সাতলা বিলের সৌন্দর্য দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।

উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আলী সুজা জানান, প্রকৃতির ক্ষতি না করে পর্যটকদের সুবিধা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করাই প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য। সাতলা বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখেই পর্যটনকেন্দ্রটির উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জীববৈচিত্র্য রক্ষার তাগিদ

তবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সাতলা বিলের পরিচিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার, পানিদূষণ কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ বিলের স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

তাদের দাবি, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বিলের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, শাপলার বিস্তার, জলজ উদ্ভিদ, পাখি ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পর্যটকদেরও নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলা, প্লাস্টিক ব্যবহার ও শাপলা নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে সচেতন করা প্রয়োজন।

কীভাবে যাবেন সাতলা বিলে

ঢাকা থেকে সড়কপথে প্রথমে বরিশাল শহরে এসে সেখান থেকে উজিরপুরের ইচলাদী বাসস্ট্যান্ডে যেতে হয়। ইচলাদী থেকে ইজিবাইক, মাহিন্দ্রা বা স্থানীয় পরিবহনে সহজেই উত্তর সাতলা গ্রামে যাওয়া যায়। বরিশাল শহর থেকেও স্থানীয় পরিবহনের মাধ্যমে সাতলা বিলের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব।

তবে সাতলা বিলের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে খুব ভোরে সেখানে পৌঁছানো সবচেয়ে ভালো। সকালের প্রথম আলোয় শাপলাগুলো যখন ফুটে থাকে, তখনই বিলের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক শাপলা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।

থাকার ব্যবস্থা

সাতলা বিল এলাকায় সীমিত পরিসরে স্থানীয় খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও উন্নতমানের রাতযাপনের জন্য উজিরপুর সদর কিংবা বরিশাল শহরে থাকা সুবিধাজনক। পর্যটকরা চাইলে বরিশাল শহরে রাতযাপন করে সকালে সাতলা বিল ঘুরে দেখতে পারেন।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, জলজ জীববৈচিত্র্য আর গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল আবহ—সব মিলিয়ে সাতলার লাল শাপলা বিল এখন বরিশালের অন্যতম আকর্ষণ। পরিকল্পিত পর্যটনব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এই লাল শাপলার বিল ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে আরও পরিচিতি পেতে পারে।