শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৩২ পূর্বাহ্ন

২০০ কিলোমিটার গিয়ে হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগ ফিরিয়ে দিলেন এক প্রহরী

২০০ কিলোমিটার গিয়ে হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগ ফিরিয়ে দিলেন এক প্রহরী

ড্রাইভিং লাইসেন্স, ডেবিটকার্ড, ক্রেডিটকার্ড, প্যানকার্ড আর আধারকার্ডসহ মানিব্যাগ হারিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন জ্যোতি প্রকাশ রাম নামে ভারতের এক শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ।

কারণ এগুলো নতুন করে ইস্যু করতে কী পরিমাণ ঝক্কি পোহাতে হয়- তা ভুক্তভোগীই কেবল ঠাহর করতে পারেন। খবর বিবিসির।

কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাড়িতে এনে পৌঁছে দিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা প্রহরী মুদবির খান। তার এ অনন্য মানবিকতার জন্য প্রশংসায় ভাসছেন তিনি।

ভুবনেশ্বর শহরের রাস্তায় গত মঙ্গলবার দুপুরের দিকে বাড়ি ফেরার পথে তিনি এটি কুড়িয়ে পান।

এর মধ্যে প্রায় শ’চারেক টাকা ছিল। কিন্তু তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল সঙ্গে থাকা গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলো।

ড্রাইভিং লাইসেন্স, ডেবিটকার্ড, ক্রেডিটকার্ড, প্যানকার্ড আর আধারকার্ড দেখে ভাবছিলেন, যার মানিব্যাগ তাকে তো অনেক ভোগান্তি পোহাতে হবে।

নথিগুলো থেকে মানিব্যাগের মালিকের নাম জানতে পেরেছিলেন মুদবির খান। ব্যাগটি জ্যোতি প্রকাশ রাম নামের একজনের। কিন্তু কোনো ফোন নম্বর পাওয়া যায়নি।

ঝাড়খণ্ডের জামশেদপুর শহরের একটি দোকানের রসিদ ছিল ব্যাগের ভেতর। সেখানে ফোন করেন মুদবির। কিন্তু তারা কোনো হদিস দিতে পারেননি।

আধারকার্ডে বাড়ির ঠিকানা ছিল কেওনঝড় জেলার একটি গ্রামের। নতুন আধারকার্ডে ফোন নম্বর থাকে। কিন্তু এটি আগেকার, তাই কোনো মোবাইল নম্বর পাননি। এ কারণে তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন ওই গ্রামে যাবেন মানিব্যাগ ফিরিয়ে দিতে।

বাসে, মোটরসাইকেলে ও পায়ে হেঁটে দুশ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে মাঝরাতের পর কেওনঝড় জেলার আনন্দপুর শহরে পৌঁছেন মুদবির খান। ছোট শহর। তাই মাঝরাতে একেবারে সুনসান। বাসস্ট্যান্ডেই বাকি রাতটুকু কাটিয়ে দেন তিনি।

ভোর সাড়ে ৪টার দিকে একটা চায়ের দোকান খোলে। সেখানে খোঁজ করে জানতে পারেন ফকিরপুর গ্রামটি কোন দিকে।

একজন মোটরসাইকেল আরোহী অনুগ্রহ করে গ্রামের তিন কিলোমিটার দূরে ছেড়ে দেন তাকে। তার পর পায়ে হেঁটে তিনি গ্রামে ঢোকেন।

গ্রামের একজন চায়ের দোকানি মানিব্যাগটির মালিকের বাড়ি দেখিয়ে দেন। মানিব্যাগের মালিক জ্যোতি প্রকাশ রাম একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ।

তিনি চাকরি করেন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের জামশেদপুরে। গ্রামের চায়ের দোকানি তাকে ফোন করে মানিব্যাগ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে দেন।

ডা. জ্যোতি প্রকাশ রাম বলেন, আমি তো ফোন পেয়ে যারপরনাই অবাক। তিনি ভাবতেই পারেননি যে আগের দিন সন্ধ্যায় হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগ পর দিন ভোরের মধ্যে তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছিয়ে দিতে যাবে কেউ। ওই ব্যাগটা ফিরে পাওয়ার আশাই করেননি তিনি।

মুদবির খান ওই চিকিৎসকের বাবা এবং ভাইয়ের আধারকার্ডের সঙ্গে ডা. রামের আধারকার্ডের তথ্য মিলিয়ে ফেরত দেন মানিব্যাগটি।

ডা. রামের বাবা জোর করে যাতায়াতের খরচ হিসেবে এক হাজার রুপি হাতে গুজে দেন মুদবির খানের হাতে।

মুদবির খান একাই থাকেন ভুবনেশ্বর শহরে। উড়িষ্যারই কটক জেলার টিগ্রিয়া ব্লকে তার গ্রাম পাঙ্কাল। সেখানেই বাবা, মা, স্ত্রী, পুত্র, ভাই থাকে। পরিবারের রোজগার করা একমাত্র সদস্য তিনিই।

এভাবে একজন দরিদ্র নিরাপত্তাকর্মী এতটা কষ্ট করে মানিব্যাগ ফিরিয়ে দেবে– এতে বিস্মিত হয়েছেন ডা. রাম।

তিনি বলেন, মুদবির সাহেব যা করেছেন, তা যে শুনছে, সেই অবাক হয়ে যাচ্ছে। আমি ওকে বলেছি, ওর গ্রামের জন্য আমি কিছু করতে চাই। উনি সত্যিই একটা রোল মডেল।

তবে মুদবির খান মনে করছেন না যে, তিনি মহান কোনো কাজ করেছেন। তার মতে, হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগটি ফিরিয়ে দেয়া আমার মানবিক দায়িত্ব বলে মনে করেছি। কারণ যিনি গুরুত্বপূর্ণ নথিসহ এটি হারিয়েছেন- তার হয়রানির কথা চিন্তা করে দ্রুত আমি তা ফিরিয়ে দিতে এতটা পথ পাড়ি দিয়েছি।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2019 ajkercrimetimes.com

Design and Developed By Sarjan Faraby