তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক :: আইফোন ব্যবহারে কমছে যৌন আকাঙ্ক্ষা গবেষকদের দাবি, আইফোনের বিস্তার এবং জন্মহার হ্রাসের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে।
স্মার্টফোন মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিয়েছে। যোগাযোগ, বিনোদন, সংবাদ-সবকিছুই এখন হাতের মুঠোয়। তবে প্রযুক্তির এই বিস্তারের জন্য কমছে জনসংখ্যা। সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণা এমনই এক চমকপ্রদ ইঙ্গিত দিয়েছে। গবেষকদের দাবি, স্মার্টফোন, বিশেষ করে আইফোনের বিস্তার এবং জন্মহার হ্রাসের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে।
আমেরিকায় জন্মহার প্রায় দুই দশক ধরে কমছে, এবং গবেষকরা মনে করছেন যে তারা এর একটি সম্ভাব্য নতুন কারণ চিহ্নিত করেছেন, তা হচ্ছে আইফোন। তারা বলছেন আপনার ফোন যদি অতিরিক্ত আকর্ষণীয় হয়, তবে আপনার যৌন জীবন হয়তো তেমনটা হবে না।
আরেকটু বুঝিয়ে বলি, আইফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, তা হচ্ছে ফোনের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ। দেখা যায় রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে স্বামী-স্ত্রী যে যার ফোনে রিলস কিংবা অন্য কিছুতে ব্যস্ত। ফলে একে-অপরের সঙ্গে সময় কাটানোর কোনো আগ্রহ নেই। এদিকে যৌন সম্পর্কে ইতি ঘটছে। ফলাফল শিশু জন্মহার নিম্নমুখী।
আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সের ক্যামেরায় থাকবে বড় চমক
আমেরিকার ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ’ (এনবিইআর)-এর একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে জন্মহার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। প্রতি ১ হাজার নারীর মধ্যে গড়ে ৬৫ থেকে ৭০টি জন্ম নিবন্ধিত হতো। কিন্তু ২০০৭ সালের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বর্তমানে সেই হার কমে প্রায় ৫৪-এ নেমে এসেছে, অর্থাৎ প্রায় ২২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে আইফোন শুধুমাত্র এটি অ্যান্ড টি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহার করা যেত। ফলে কোনো অঞ্চলে আইফোনের ব্যবহার কতটা হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করত এটি অ্যান্ড টি -এর নেটওয়ার্ক কভারেজের ওপর।
পরিসংখ্যান বলছে, যেসব এলাকায় এটি অ্যান্ড টি-এর কভারেজ ছিল না, সেখানে কিশোরীদের সন্তান জন্মদানের হার কমেছে ১৩.৮ শতাংশ। আংশিক কভারেজ থাকা এলাকায় এই হার কমেছে ১৮.৯ শতাংশ। আর সবচেয়ে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কভারেজযুক্ত অঞ্চলে কিশোরী মাতৃত্বের হার ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
তবে গবেষকরা সরাসরি আইফোনকে দায়ী করছেন না। তাদের মতে, স্মার্টফোন মানুষের সামাজিক আচরণে বড় পরিবর্তন এনেছে। বাস্তব জীবনে বন্ধু-বান্ধব বা সঙ্গীর সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে মানুষ ক্রমশ ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় ব্যয় করছে। এর ফলে তরুণদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের প্রবণতাও কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে অনলাইন বিনোদন, বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্ট দেখার প্রবণতা বেড়েছে। গবেষণা চলাকালে গুগলে ‘পর্ন’ শব্দটি দিয়ে অনুসন্ধানের হার দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জেনারেল সোশ্যাল সার্ভে’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ভিডিও দেখার হার সব বয়সভিত্তিক গোষ্ঠীতেই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্যদিকে, স্মার্টফোনের মাধ্যমে গর্ভনিরোধক পদ্ধতি, জন্মনিয়ন্ত্রণ ও গর্ভপাতসংক্রান্ত তথ্য এখন আগের তুলনায় অনেক সহজে পাওয়া যায়। ফলে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ কমাতে তরুণদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা।
একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে ‘ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটি’র অর্থনীতিবিদদের পরিচালিত আরেকটি গবেষণায়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা ১২৮টি দেশের স্মার্টফোন ব্যবহার এবং কিশোরী জন্মহারের সম্পর্ক খতিয়ে দেখেন। গবেষণায় দেখা যায়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, গর্ভপাত আইন, অর্থনৈতিক অবস্থা কিংবা সরকারি নীতিতে ব্যাপক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশে প্রায় একই সময়ে জন্মহার কমার প্রবণতা দেখা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন ধরা পড়েছে। ২০০৩ সালে একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৬৮ মিনিট সরাসরি বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। ২০১৯ সালে সেই সময় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৮ মিনিটে, যা প্রায় ৪৪ শতাংশ হ্রাসের সমান।অন্যদিকে কম্পিউটার ও ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে কাটানো সময় দিনে ২২ মিনিট থেকে বেড়ে ৯৬ মিনিটে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এই সময়ের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩৩৬ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, বাস্তব সামাজিক যোগাযোগের জায়গা যত বেশি ভার্চুয়াল যোগাযোগ দখল করছে, তার প্রভাব ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও জন্মহারের ওপরও পড়ছে। যদিও স্মার্টফোনই একমাত্র কারণ নয়, তবুও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন আধুনিক সমাজে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: দ্য রেজিস্টারড, দ্য নিউয়র্ক টাইমস।
কেএসকে