নিউজ ডেস্ক :: এইচএসসিতে পাস কম, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ৮ লাখের বেশি আসন ফাঁকা থাকার শঙ্কা
এবার উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে পাসের হার সবচেয়ে কম। সর্বোচ্চ ফলের সূচক জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পরীক্ষার ফলের এই নিম্নমুখী প্রবণতার প্রভাব পড়বে উচ্চশিক্ষায় ভর্তিতেও।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় মোট আসন এবং এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় নিলে ৮ লাখের বেশি আসন খালি থাকতে পারে।
এর আগে এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রায় ১৬ লাখ আসন খালি থাকার তথ্য পাওয়া যায়। যদিও এখনো তৃতীয় ধাপে ভর্তির প্রক্রিয়া চলছে, তাতেও খালি আসনের সংখ্যা খুব বেশি কমবে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
ফলে মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষা—দুই স্তরেই বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গত শনিবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীন পরীক্ষায় ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। ফল প্রকাশের পর এখন উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হবে।
উচ্চশিক্ষায় আসন বেশি, পাস কম
দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের তদারকির দায়িত্বে রয়েছে ইউজিসি। সংস্থাটির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এবার উচ্চশিক্ষায় মোট আসন রয়েছে ১৪ লাখ ৯২ হাজারের মতো। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ১০ লাখের বেশি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চার লাখের বেশি আসন রয়েছে। এ হিসাব অনুযায়ী, এবার উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সবাই উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হলেও ৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি আসন খালি থাকার কথা।
বর্তমানে দেশে ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১১৭টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তবে উচ্চশিক্ষার সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তির পরিস্থিতি এক রকম হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন রয়েছে কমবেশি ৬৩ হাজারের কিছু বেশি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত ভর্তির জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পরিচিত ও ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকবে। তবে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া কঠিন হতে পারে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজে চাপ
দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ রয়েছে ২ হাজার ২৫৭টি। এর মধ্যে ৮৮১টি কলেজে স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু আছে। এসব কলেজে সম্মান কোর্সে আসন রয়েছে সাড়ে চার লাখের বেশি। এ ছাড়া অনেক কলেজে স্নাতক (পাস) কোর্স চালু রয়েছে, যেখানে আসন প্রায় সাড়ে চার লাখ। প্রফেশনাল কোর্সেও কমবেশি ১০ হাজার আসন রয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর আসনসংখ্যা বিবেচনায় নিলে এবার অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কলেজের শিক্ষার্থী আকর্ষণের সক্ষমতা কম, সেগুলো বেশি সংকটে পড়তে পারে।
গতকাল শনিবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে সচিবালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছিলেন, উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থীই উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ পাবেন।
ফেল করা শিক্ষার্থীদের আবার পরীক্ষার সুযোগ
এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন। তাঁদের আগামী এক মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য হওয়া বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। এ পরীক্ষা আগামী ডিসেম্বরে নিয়ে একই মাসে ফল প্রকাশের প্রাথমিক চিন্তাভাবনা রয়েছে। যাতে এ বিশেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের চলতি শিক্ষাবর্ষেই উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পরের বছর আবার পরীক্ষায় বসতে হয়। সে ক্ষেত্রে শুধু অকৃতকার্য হওয়া বিষয়গুলো অথবা ইচ্ছা করলে সব বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের প্রায় এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। নতুন উদ্যোগ কার্যকর হলে এ অপেক্ষা কমবে।
তবে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সবাই আবার পরীক্ষায় অংশ নেবেন বা পাস করবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই তাঁদের সম্ভাব্য ফলও উচ্চশিক্ষার আসন খালি থাকার হিসাবের সঙ্গে সরাসরি যোগ করা যাচ্ছে না। তবে ধারণা করা যায়, এখানকার বেশ কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী এতে যুক্ত হবেন।
প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত পরিকল্পনা
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা—সব স্তরেই শিক্ষার্থীর চাহিদা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, শিক্ষক ও অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। কোথাও শিক্ষার্থী কম, কিন্তু শিক্ষক ও অবকাঠামো রয়েছে; আবার কোথাও শিক্ষার্থী থাকলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। বছরের পর বছর ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও পরিকল্পিতভাবে তা মোকাবিলার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।
এ পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আসনসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা এবং শিক্ষার্থীর চাহিদা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা। এ জন্য দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সমন্বিত ‘ম্যাপিং’ করা দরকার। অর্থাৎ কোন এলাকায় কতটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, কোথায় কী ধরনের শিক্ষার চাহিদা রয়েছে এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে