নিউজ ডেস্ক :: এক বছরে সরকারের ঋণ নেওয়া বেড়েছে ৩০.৪৩ শতাংশ
কমেছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ
#ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণও বাড়ছে
#অর্থ সরবরাহ বেড়েছে ১১ শতাংশের বেশি
#রপ্তানি কমেছে, আমদানি বেড়েছে
দেশের অর্থনীতিতে অর্থ ও ঋণপ্রবাহের চিত্রে বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। একদিকে সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ায় সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দ্রুত বেড়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জুন মাস শেষে সরকারি খাতে ঋণ এক বছরের ব্যবধানে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৬ লাখ ৯৯ হাজার ৯৪৮ কোটি ৮০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। জুন শেষে এ খাতে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, 'ঋণের উচ্চ ব্যয় বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা কমার একটি কারণ হলেও এটি প্রধান কারণ নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জ্বালানি সংকট, যা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। তাছাড়া সরকারের ব্যাংকমুখী হওয়া ও রাজস্ব আয়ের পরিধি বৃদ্ধি না পাওয়াও এর প্রধান কারণগুলোর অন্যতম
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধিই মূলত সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়ার প্রধান কারণ। জুন মাস শেষে দেশে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ২৫ হাজার ৮১৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা এক বছরের আগের তুলনায় ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৬০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ -এ এই বৃদ্ধি ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
অর্থনীতিতে সরকারের ঋণ গ্রহণের চাপ বৃদ্ধির চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে সরকারি খাতের ঋণে। ২৫ সালের জুন থেকে গত জুন পর্যন্ত এক বছরে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ২৮২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে এ খাতে ঋণ বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার ৩৬৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা, সেখানে ২০২৫-২৪ অর্থবছরে তা আড়াই গুণেরও বেশি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, কম কর রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি, ঋণের সুদ পরিশোধ ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। সেই চাপ সামাল দিতে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ বাড়ার ফলে সরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
সরকারি খাতের মধ্যে সরকারের নিট ঋণই মূল চালিকাশক্তি। জুন শেষে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৬৫৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে ৩৪ দশমিক ৫১ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮১ কোটি ২০ লাখ টাকা। অন্যদিকে অন্যান্য সরকারি খাতে ঋণ ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ কমে ৪৩ হাজার ২৯০ কোটি টাকায় নেমেছে।
চলতি অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার ৭৯৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে এই ঋণ বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল মাত্র ২ হাজার ৭৬৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অর্থবছরের শুরুতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের চাপ বহুগুণ বেড়েছে।
গত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের মোট নিট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২৭৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিট ঋণ ৯৭ হাজার ২৭৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা এবং ডিপোজিট মানি ব্যাংকগুলো থেকে নিট ঋণ ৬ লাখ ২ হাজার ৯৯৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ২২৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। একই সময়ে ডিপোজিট মানি ব্যাংকগুলো থেকে বেড়েছে ১১ হাজার ৫৭০ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
সরকারি ঋণের বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে গতি কমেছে। জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ ঋণ বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৭৮ হাজার ১৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অথচ তার আগের অর্থবছরের একই সময়ে বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৪৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা
অর্থাৎ একদিকে সরকারি খাতে ঋণ গ্রহণের গতি বেড়েছে, অন্যদিকে উৎপাদন ও বিনিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির গতি কমেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ২৮২ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যেখানে বেসরকারি খাতে তা ৭৮ হাজার ১৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
জুন শেষে দেশে ব্যাপক অর্থ বা ব্রড মানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ১৬ হাজার ২৮৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়েছে ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্রড মানি বেড়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৬৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তার আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৮৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্রড মানির সবচেয়ে বড় উপাদান নেট দেশীয় সম্পদ বা এনডিএ। অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধিতে এনডিএ এখনো প্রধান ভূমিকা রাখছে এবং এর ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিই মুদ্রা সম্প্রসারণের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে।
এদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আমানতও বেড়েছে। জুন শেষে ব্যাংক আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৭৯ হাজার ৯১১ কোটি ১০ লাখ টাকা। এক বছরে আমানত বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমানত বেড়েছে ২ লাখ ১ হাজার ৭৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৭২ কোটি ৩০ লাখ টাকার বৃদ্ধির চেয়ে বেশি। আমানত বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল মেয়াদি আমানত বৃদ্ধি।
অর্থনীতির বহিঃখাতে কিছু চাপ থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ১৫ আগস্ট শেষে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে, ১৫ আগস্ট পর্যন্ত রিজার্ভ ছিল ৩০ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রিজার্ভ বেড়েছে ২০ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে ৩০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রয়েছে। রেমিট্যান্সের প্রব