মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ :: ক্ষমা ও রহমতের বরকতময় রজনী : শবে বরাত
মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি বান্দার গুনাহ ক্ষমা করার জন্য প্রতিনিয়ত সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত রাখেন। কখনো সময়ের মাধ্যমে, কখনো স্থানের মাধ্যমে—যেন মানুষ অনুতপ্ত হয়ে তাঁর দরবারে ফিরে আসে। এমনই এক বরকতময় সময় হলো শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, যা আমাদের মাঝে পরিচিত শবে বরাত নামে।
কোরআনুল কারিমে এ রাতকে বলা হয়েছে “লাইলাতুম মুবারাকা”—অর্থাৎ বরকতময় রাত। আর হাদিস শরিফে একে উল্লেখ করা হয়েছে “লাইলাতুন নিস্ফি মিন শাবান” নামে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে একটি শ্রেণি রয়েছে যারা মতভিন্নতার কারণে শবে বরাতের অস্তিত্ব ও তাৎপর্যই অস্বীকার করে বসে এবং এ রাতের সব আমলকে বিদআত বলে আখ্যায়িত করে। অথচ বাস্তবতা হলো—শবে বরাতের ফজিলত ও গুরুত্ব কোরআনুল কারিম এবং সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
ক্ষমা ও রহমতের রজনী
হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন—
“শাবান মাসের অর্ধরাত্রিতে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।”
(সহিহ ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫)
হাদিস বিশারদ আল্লামা নূরুদ্দীন হাইসামি (রহ.) বলেন, এ হাদিসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য।
এ বিষয়ে হজরত আবু বকর (রা.), আলী (রা.), আবু হুরাইরা (রা.), আয়েশা (রা.)সহ বহু সাহাবি থেকে বর্ণনা পাওয়া যায়।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘ সময় সিজদায় ছিলেন। তিনি পরে বলেন—
“হে আয়েশা! এ রাতটি হলো অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করেন, তবে হিংসুকদের তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন।”
(শুআবুল ইমান)
ইবাদত ও রোজার ফজিলত
হজরত আলী (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন—
“শাবান মাসের ১৪ তারিখ রাতে তোমরা ইবাদতে মশগুল থাকো এবং পরদিন রোজা রাখো। এ রাতে আল্লাহ প্রথম আসমানে নেমে এসে বলেন—কে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ)
যদিও হাদিসটি ফাজায়েলের ক্ষেত্রে সামান্য দুর্বল, তবে মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত মতে এটি আমলের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য।
ভাগ্যনির্ধারণের রজনী
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—
“নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে। এ রাতে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করা হয়।”
(সুরা দুখান: ৩-৪)
কয়েকজন তাফসিরকারের মতে, এখানে উল্লিখিত বরকতময় রাত শবে বরাত।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন—
“অর্ধ শাবানের রাতে এক বছরের সব সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয় এবং শবে কদরে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।”
(তাফসিরে কুরতুবি)
করণীয়
শবে বরাতে বেশি বেশি—
তাওবা ও ইস্তিগফার
দরুদ শরিফ
কোরআন তেলাওয়াত
নফল ও কাজা নামাজ
জিকির-আজকার
কবর জিয়ারত
আল্লাহর দরবারে একান্তভাবে নিজের প্রয়োজন তুলে ধরতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের সবাইকে শবে বরাতের ফজিলত উপলব্ধি করে যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করেন। আমিন।
লেখক :- মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।