নিজস্ব প্রতিবেদক :: ছিনতাইয়ের আখড়া পটুয়াখালীর লোহালিয়া সেতু।
বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী শহরসংলগ্ন লোহালিয়া নদীর ওপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন লোহালিয়া সেতুটি উদ্বোধনের সময় ছিল জেলার মানুষের জন্য বড় স্বপ্নের বাস্তবায়ন। প্রায় ১০১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৪৬৪ মিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতু চালু হওয়ায় পটুয়াখালী জেলা সদরের সঙ্গে বাউফল, দশমিনা ও গলাচিপা উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্যখাতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
তবে উদ্বোধনের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই সেতুটির বেশিরভাগ ল্যাম্পপোস্টের আলো অচল হয়ে পড়েছে। ফলে সন্ধ্যার পর পুরো সেতু এলাকায় নেমে আসে অন্ধকার। স্থানীয়দের দাবি, এই অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে সেতু ও আশপাশের এলাকায় বাড়ছে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা।
রোববার (৮ মার্চ) সন্ধ্যা ৭টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুতে মোট ৬১টি ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৫টি ল্যাম্পপোস্টে আংশিকভাবে আলো জ্বলছে। ওই ১৫টির মধ্যেও আবার ৩টি বাতি নিভু নিভু অবস্থায় জ্বলছে। বাকি ৪৬টি ল্যাম্পপোস্ট সম্পূর্ণ অচল হয়ে রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাতে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় সেতু এলাকায় প্রায়ই ছিনতাই, মাদক গ্রহণসহ নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহী ও পথচারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
ব্রিজ দিয়ে প্রতিনিয়ত পাড়াপাড় হওয়া অটোচালক মো. মোশারফ জানান, ব্রিজ উদ্বোধনের সময় অনেক আলো ছিল। কিন্তু বছর খানেক ধরে সেই আলো আর নেই। এতগুলো বাতি কিন্তু মাত্র ১০-১২ টা জ্বলে। আমরা সন্ধ্যার পরে তেমন অটো চালানোই বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ছিনতাইকারীরা সব কেড়ে নিচ্ছে। লোয়ালিয়া সেতু থেকে কাশিপুর যাওয়ার রাস্তাটি তো ছিনতাইকারীদের হটস্পট। ব্রিজ এবং এর আশপাশে এমন কোন দিন নেই যেদিন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে না।
পটুয়াখালী শহরে ঘুরে ভিক্ষাবৃত্তি করেন কমলাপুর ইউনিয়নের ধরান্দী গ্রামের মো. মনির। প্রতিদিন এই সেতু দিয়েই বাড়িতে যাতায়াত করেন তিনি। একজন ভিক্ষুক হয়েও ছিনতাইকারীদের হাত থেকে রক্ষা পাননি বলে জানান তিনি।
মনির বলেন, ‘আমি সারাদিন শহরে যাইয়া ভিক্ষা করি। একদিন আমি বাসায় আওয়ার সময় অনেক রাইত হইয়া যায়। রাইত প্রায় ১১ টার দিকে ব্রিজের উপরে কয়েকজন হাতে রামদা নিয়া আমাগো অটো থামায়। আমার সারাদিনের ভিক্ষা কইরা পাওয়া সব টাহা রামদা ঠেকাইয়া নিয়া যায়। আমি দেতে না চাইলে রামদা ঠেকাইয়া কয়, তোরে খুন কইরা ফালামু, সাথে যা আছে সব কিছু দিয়া যা। তাই আমি প্রাণের ভয়ে সব টাহা দিয়া দিছি তাদের।’
শুধু সেতুতেই নয়, সেতুর লোহালিয়া অংশের আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়েও ছিনতাইয়ের অভিযোগ স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পটুয়াখালী শহরের বনানী-কমলাপুর বাজার এলাকায় ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালানো এক চালক বলেন, আমরা যারা প্রতিনিয়ত মোটরসাইকেল চালাই তাদের জন্য সন্ধ্যার পরে এই সড়কটি খুবই ভয়ঙ্কর একটা সড়ক। ব্রিজটি উদ্বোধন হয়েছে মাত্র দুই বছর হলো কিন্তু এর মধ্যেই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে পুরো ব্রিজ। এতে আমরা অনেক ভয়ে আছি। ব্রিজের ওপারের রাস্তায় রাত দশটা এগারোটার পর পরই সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ৮ থেকে ১০ জনের একটি ছিনতাইকারীর দল যাদের কাছে যা পায় রেখে দেয়। মানুষের কাছ থেকে টাকা পয়সা মোবাইল স্বর্ণ সবকিছু রেখে দেয় এবং তাদের হাতে থাকে দেশীয় অস্ত্র। আমরা চাই, এই ব্রিজটি সম্পূর্ণ লাইটে আলোকিত হয়ে থাক এবং ব্রিজের ওপার থেকে কাশিপুর বাজার পর্যন্ত ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন করা হোক, যাতে ছিনতাইকারীরা আর ছিনতাই না করতে পারে।
গত ২৯ জানুয়ারি রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে সেতু থেকে কিছুটা সামনে এগিয়ে ছিনতাইয়ের শিকার হন পটুয়াখালীর তিন সাংবাদিক এ জেড এম উজ্জ্বল, হেলাল উদ্দিন রিপন ও আরিফ হোসেন টিটু। পরদিন এ ঘটনায় পটুয়াখালী সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন তারা। ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের দাবি, এটি ছিনতাই নয়, সংঘবদ্ধ ডাকাতি।
সাংবাদিক এ জেড.এম উজ্জ্বল বলেন, আমরা একটি জরুরি কাজে লোহালিয়া ব্রিজ পার হয়ে সামনের দিকে যাচ্ছিলাম। একটু দূরে এগিয়েই কাকরাবুনিয়া খেয়াঘাটের আগে একটি বটগাছ সংলগ্ন রাস্তায় একটি আস্ত গাছ কেটে ফেলে রাখা হয়। আমরা সেখানে থামলে পাঁচ-ছয় জনের একটি সঙ্ঘবদ্ধ দল দেশীয় অস্ত্র ঠেঁকিয়ে আমাদের তিনজনের ৪ টি মোবাইলফোনসহ সাথে থাকা নগদ অর্থ হাতিয়ে নেয়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়েও কোন লাভ হয়নি। এ সময় আরও দুইটি মিনি ট্রাক ও দুজন ব্যাংক কর্মকর্তার কাছ থেকেও সবকিছু হাতিয়ে নেওয়া হয়। এ বিষয়ে আমরা লিখিতভাবে পুলিশকে জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা কোনো ফল পাইনি।
গত বছরের নভেম্বরে একই স্থানে ছিনতাইয়ের শিকার হন মো. জাহাঙ্গীর নামের আরেক যাত্রী। স্ত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়ে শরীয়তপুর থেকে গ্রামের বাড়ি খারিজ্জমায় যাওয়ার পথে তার প্রাইভেটকার থামিয়ে ছিনতাই করা হয় বলে জানান তিনি।
জাহাঙ্গীর বলেন, আমার স্ত্রীর মৃত্যুর খবর শুনে শরীয়তপুর থেকে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে লোহালিয়া ব্রিজের ওপারে কয়েকজন আমাদের ভাড়া করা প্রাইভেটকার থামিয়ে সোনা-গয়না, টাকা-পয়সা, মোবাইল সবকিছু নিয়ে গেছে। আমার আইডি কার্ডটাও নিয়ে গেছে। আমি চাই ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, এজন্য পুলিশের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
স্থানীয়রা বলছেন, শুধু সেতু নয়, নিরাপদ চলাচলের জন্য সেতুর আশপাশের অন্ধকারাচ্ছন্ন সড়কেও সড়কবাতির ব্যবস্থা করা জরুরি।
পটুয়াখালী জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব জাকারিয়া আহমেদ বলেন, ব্রিজের ওপারেই লোহালিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আমি। বিভিন্ন সময়ে শুনেছি ব্রিজের ওপারের অন্ধকারাচ্ছন্ন যে অংশটা সেখানে ছিনতাইকারীরা ওঁৎ পেতে থাকে। এভাবে ব্রিজ ও রাস্তা অন্ধকার থাকলে ঈদের আগে মানুষের সমস্যা হতে পারে। যদি ঈদের আগে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয় তাহলে সাধারণ মানুষের সুবিধা হবে।
পটুয়াখালী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হোসেন আলী মীর বলেন, লোহালিয়া ব্রিজটি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ২০২২ সালে হস্তান্তর করেছে। তাদের মেইনটেনেন্স (রক্ষণাবেক্ষণ) পিরিয়ড ছিল এক বছর। সেটাও অতিবাহিত হয়ে গেছে। বর্তমানে কিছু লাইট অকেজো হয়ে আছে, এ বিষয়গুলো আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অবহিত করব। বর্তমানে কোন ফান্ড নেই, ফান্ড পেলে আমরা অচিরেই ব্যবস্থা নেব।
ব্রিজে ছিনতাইয়ের অভিযোগের বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল বলেন, আমাদের পটুয়াখালী লোহালিয়া ব্রিজ হয়ে বাউফল এবং দশমিনের দিকে যে রাস্তাটি একটু নীরব এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন, রাতে এখানে দুইটি পেট্রোল (টহল পুলিশের দল) ওখানে কাজ করে, যাতে ক্রস পেট্রোলিং এর মাধ্যমে কোন নিরাপত্তার ঝুঁকি না থাকে। কিছুদিন আগে এখানে একটি ঘটনা ঘটেছে। কিছু লোকজনের গাড়ি আটকিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনার তদন্ত করে আমরা যাদের সংশ্লিষ্ট পেয়েছি, তাদের মধ্যে আমরা ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। কারা কারা করেছে, এটা আমরা জানতে পেরেছি। শিগগিরই বাকিদেরকে আমরা গ্রেপ্তার করব।