শুধু সিরাজুল নন, একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী। তাদের দাবি, বরিশাল সেটেলমেন্ট অফিসের একটি চক্র প্রকৃত মালিকদের রেকর্ডীয় সম্পত্তি জরিপে অন্যের নামে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের হয়রানির মুখে ফেলছে। পরে ওই জমি নিজেদের নামে ফেরত নিতে প্রকৃত মালিকদের মামলা-মোকদ্দমা ও অফিসে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে। এতে বছরের পর বছর সময়ের পাশাপাশি বিপুল অর্থও ব্যয় হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
সিরাজুল আলম নয়ন জানান, তার বাবা মৃত কদম আলী কন্ডাক্টর প্রায় ৫৬ বছর আগে সংশ্লিষ্ট সাড়ে ৯ শতাংশ জমি কিনে ভোগদখল করে আসছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর ওয়ারিশ হিসেবে তিনি জমিটি ভোগদখল করছেন।
কিন্তু গত জুলাইয়ে হঠাৎ সেটেলমেন্ট অফিস থেকে তাকে জমির কাগজপত্রসহ হাজির হওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে জানতে পারেন, তার ভোগদখলে থাকা সাড়ে ৯ শতাংশ জমি জরিপে দুই অপরিচিত নারীর নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সিরাজুলের দাবি, ওই দুই নারী তার পরিবারের কোনো ওয়ারিশ নন। এমনকি তাদের তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেনও না।
জরিপের কাগজে ওই দুই নারী হিসেবে বরিশাল সদর উপজেলার চরহোগলা এলাকার পশুরকাঠী গ্রামের মেহেদী হাসানের স্ত্রী শুভ আক্তার এবং সদর উপজেলার চরমনাই এলাকার রাজারচর গ্রামের মনির হোসেনের স্ত্রী রাহিমার নাম উল্লেখ রয়েছে বলে জানান তিনি।
সিরাজুল বলেন, দলিল থেকে শুরু করে পর্চা ও অন্যান্য রেকর্ডীয় কাগজপত্র তার কাছে থাকার পরও কীভাবে তার জমি অপরিচিত ব্যক্তিদের নামে জরিপে অন্তর্ভুক্ত হলো, সেটিই তার কাছে বড় প্রশ্ন।
সিরাজুল আলম নয়নের দাবি, শুধু তার জমি নয়, একই এলাকার আরও ২১ জনের পাঁচটি দাগের মোট ৬৩ শতাংশ জমিও ওই দুই নারীসহ সাতজনের নামে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সাতজনের মধ্যে সেটেলমেন্ট অফিসের দালাল হিসেবে পরিচিত আলমগীর হোসেন, ছেনোয়ারা বেগম, সেলিম ও সোহাগের নামও রয়েছে।
সিরাজুল বলেন, এসব জমির প্রকৃত মালিকরা বছরের পর বছর ধরে জমিগুলো ভোগদখল করে আসছেন। তারপরও জরিপের কাগজে অপরিচিত ও সংশ্লিষ্ট নন এমন ব্যক্তিদের নাম কীভাবে এসেছে, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
বরিশাল সেটেলমেন্ট অফিসের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন সিরাজুল। তার অভিযোগ, তার জমির জরিপের সঙ্গে সেটেলমেন্ট অফিসের চার্জ অফিসার ফজলে এলাহী, পেশকার মো. রফিক, সার্ভেয়ার মো. ইদ্রিসসহ একটি বড় চক্র জড়িত।
সিরাজুলের অভিযোগ, এই চক্র বিভিন্ন মানুষের রেকর্ডীয় সম্পত্তি ভুয়া বা অপরিচিত ব্যক্তির নামে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করে আসছে। এ কাজের বিনিময়ে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া হয় বলেও দাবি তার।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জরিপে জমি অন্যের নামে অন্তর্ভুক্ত করার পর প্রকৃত মালিককে সেটেলমেন্ট অফিসে মামলা করতে হয়। মামলা করতে গেলেও বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় বলে তার অভিযোগ। এরপর মামলা নিষ্পত্তি করে জমি নিজের নামে ফেরত পেতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়।
সিরাজুলের ভাষ্য, যাদের পেছনে প্রভাবশালী শক্তি রয়েছে, তারা কোনোভাবে জমি ফেরত পেলেও সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন হয়রানির শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল মালিকরা শেষ পর্যন্ত জমি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দলিল থেকে শুরু করে পর্চাও রয়েছে। এরপরও সেটেলমেন্ট অফিসের ওই চক্রটি একটি জমিখেকো চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বছরের পর বছর এ ধরনের কাজ করে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হলেও তারা বহাল তবিয়তে থাকেন। চক্রটির কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অবগত এবং তাদের কাছ থেকেও সুবিধা নেওয়া হয় বলে জানতে পেরেছি।’
নিজের জমি নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিরাজুল আলম নয়ন।
তিনি বলেন, ‘বরিশাল সেটেলমেন্ট অফিসে আল্লাহর গজব পড়বে। তারা যেভাবে মানুষকে হয়রানি করছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমি থেকে শুরু করে যারা এর ভুক্তভোগী, সবার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। এখন চিন্তা হচ্ছে, কীভাবে ওই নাম কেটে সেটেলমেন্ট অফিস থেকে বের হয়ে আসবো।’
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন শামসুল আলম, হারুনসহ আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী।
তাদের দাবি, স্বাধীনতার আগে থেকেই তাদের বাবা-দাদারা সংশ্লিষ্ট জমিগুলো ভোগদখল করে আসছেন। তাদের মৃত্যুর পর ওয়ারিশ সূত্রে তারা জমির মালিকানা পেয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তাদের নামে রেকর্ড, পর্চা ও দলিলও হয়েছে।
কিন্তু এতসব কাগজপত্র থাকার পরও তাদের জমির বড় একটি অংশ জরিপে অন্যের নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
ভুক্তভোগীদের দাবি, যাদের নামে জমি দেওয়া হয়েছে, তারা তাদের পরিবারের কোনো ওয়ারিশ নন। এমনকি অনেককে তারা চেনেনও না।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, জরিপে যাদের নামে জমি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাদের নামের সঙ্গে যে মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে, সেখানে ফোন করেও কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।
এমনকি জরিপের কাগজে দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী খোঁজ করেও অনেকের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি তাদের।
এ কারণে ভুক্তভোগীদের ধারণা, জমি দখলের উদ্দেশ্যে সেটেলমেন্ট অফিসের একটি চক্র এসব ব্যক্তিকে ব্যবহার করছে।
ভুক্তভোগীরা দাবি করেন, শুধু বরিশাল নগরী নয়—বরিশাল সদর উপজেলা থেকে শুরু করে জেলার ১০ উপজেলাতেও রেকর্ডীয় সম্পত্তি অন্যের নামে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করার এমন বহু অভিযোগ রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, প্রকৃত মালিকদের জমি অন্যের নামে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করার পর মালিকদেরই মামলা করতে হচ্ছে। এরপর জমি ফেরত পেতে বছরের পর বছর সেটেলমেন্ট অফিস ও আদালতে ঘুরতে হচ্ছে।
অনেকেই জমির মূল্যের চেয়েও বেশি টাকা মামলা, আইনজীবী, যাতায়াত ও দৌড়ঝাঁপে ব্যয় করেছেন বলে জানান তারা।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—প্রকৃত মালিকের দলিল, পর্চা ও রেকর্ডীয় কাগজপত্র থাকার পরও কীভাবে জরিপে অপরিচিত ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়? জমির মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী? আর ভুল বা অনিয়মের কারণে প্রকৃত মালিককে কেন বছরের পর বছর মামলা ও হয়রানির মধ্যে পড়তে হবে?
তাদের দাবি, এ ধরনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে জরিপ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রকৃত মালিকদের হয়রানি বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, এর আগেও একইভাবে জরিপের নামে রেকর্ডীয় সম্পত্তি অন্যের নামে দেওয়ার অভিযোগে বহু মানুষ মামলা করেছেন। অনেকেই এখনও বছরের পর বছর অফিস ও আদালতের দ্বারে ঘুরছেন।
তাদের দাবি, ভূমি জরিপের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি এবং অভিযোগগুলোর দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন।