নিজস্ব প্রতিবেদক :: দীর্ঘ ৯ মাস ধরে সয়েল টেস্ট সম্পন্ন হলেও অনুমোদন হয়নি ব্রিজের নকশা জটিলতায় আটকে আছে মীরগঞ্জ সেতুর কাজ
নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল :: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নদীবেষ্টিত বরিশালের মুলাদী-হিজলা এবং মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলাবাসীর মুখে হাসি ফুটেছিল গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। ওইদিন মুলাদী-বাবুগঞ্জ উপজেলার মধ্যবর্তী মীরগঞ্জ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও নদী শাসন কাজ সম্পন্ন করে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে মীরগঞ্জ সেতু। তবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর নির্ধারিত মেয়াদের প্রায় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো দৃশ্যমাণ হয়নি নির্মাণকাজ।
দীর্ঘ ৯ মাস ধরে সয়েল টেস্ট সম্পন্ন হলেও অনুমোদন হয়নি ব্রিজের নকশা। এমনকি নানা জটিলতায় শুরু হয়নি ভূমি অধিগ্রহণ। ফলে কবেনাগাদ আড়িয়াল খাঁ নদে ‘জুলুমের কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে পরিচিত মীরগঞ্জ ফেরি এবং খেয়াঘাটের নৈরাজ্য থেকে মুলাদী-হিজলা এবং মেহেন্দিগঞ্জের মানুষের মুক্তি কবে মিলবে এর সঠিক উত্তর মেলেনি প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। যদিও চলতি বছরের ডিসেম্বরে সেতু দৃশ্যমাণ হওয়ার আশা সড়ক ও জনপথ বিভাগের দায়িত্বশীলদের।
বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন মন্ত্রীপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেনের প্রচেষ্টায় ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর মুলাদী-বাবুগঞ্জের মধ্যবর্তী আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর মীরগঞ্জ সেতু নির্মাণে ‘উন্নয়ন প্রকল্প-প্রস্তাবনা (ডিপিপি)’ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
ডিপিপি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও নদী শাসন কাজ সম্পন্ন করে মীরগঞ্জ সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার কথা রয়েছে।
প্রায় দেড় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ‘কেবল স্টেইট এক্সট্রা ডোজ’ টাইপ এবং চট্টগ্রাম দ্বিতীয় কর্ণফুলী ও পটুয়াখালীর পায়রা সেতুর আদলে মীরগঞ্জ সেতুটি নির্মাণে দেশীয় তহবিল থেকে ব্যয় প্রস্তাব করা হয় এক হাজার ৭২ কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রাক-যোগ্যতাসম্পন্ন সাতটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের দরপ্রস্তাব যাচাই-বাছাই এবং আর্থিক মূল্যায়ন শেষে মন্ত্রণালয় হয়ে উপদেষ্টা পরিষদের ক্রয় কমিটির বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়।
পরে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন’-এর সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করে সরকার। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি সরঞ্জামাদি প্রস্তাবিত ব্রিজ এলাকায় সন্নিবেশ করারও কথা ছিল।
সেই লক্ষ্য নিয়ে ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর মীরগঞ্জে ফেরিঘাটে আনুষ্ঠানিকভাবে এক হাজার ৪৮৪ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সড়ক ও সেতু এবং জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ও নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেতু নির্মাণ অগ্রগতি আর দৃশ্যমাণ হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি করেছে সড়ক ও জনপদ বিভাগ। নদীর কিছু অংশ ব্যক্তি মালিকানা জমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ নিয়ে আপত্তি এবং অভিযোগ তোলা হয়েছে। যা সার্ভেসহ তদন্ত করছে জেলা প্রশাসন।
মীরগঞ্জ সেতু প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী দিদারুল আলম জানান, ব্রিজ নির্মাণের কাজ পেয়েছে চায়নার প্রতিষ্ঠান। তারা দরপত্রের শর্তানুযায়ী কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তারা সয়েল টেস্ট সম্পন্ন করেছে। পরে গত আগস্ট মাসে ডিজাইন তৈরি করে তা অনুমোদনের জন্য জমা দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মীরগঞ্জ সেতু নির্মাণের টেন্ডারের শর্তটাই এরকম যে, টেন্ডারের পরে ডিজাইন করতে হবে। ওই ডিজাইন যাচাই-বাছাইয়ের কনসালটেন্ট নিয়োগ করা আছে। তারা ডিজাইন যাচাই বাছাইয়ের পর উপস্থাপন করবে।
এরপর সড়ক ও জনপথ বিভাগের সেতু নির্মাণে যে ডিজাইন কমিটি আছে, সেই কমিটি তাদের তৈরি করা ডিজাইন অনুমোদন করবে। তারা অনুমোদন দিলেই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়ে যাবে। তবে দিনক্ষণ বলা কঠিন।’
ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এপ্রোচ সড়কের জন্য আমাদের প্রস্তাবনা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে জমা দিয়েছি। নদীর এবার এবং ওপারে প্রায় ২১ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। আমাদের প্রস্তাবনাগুলো জেলা প্রশাসন পর্যায়ক্রমে তদন্ত করছে। জমির মূল্যও তারা নিরূপণ করবে।’
জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার বলেন, ‘ব্রিজের নির্মাণকাজ কবে দৃশ্যমাণ হবে সেটা আমরা অবগত নই। ব্রিজের যে অ্যাপ্রোচ সড়ক হবে সেটার জন্য মুলাদী ও বাবুগঞ্জ অংশে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ করছি। এর জন্য আমরা প্রত্যাশী সংস্থা থেকে প্রস্তাবনা পেয়েছি। প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ইতোমধ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কমিটি ইতোমধ্যে সম্ভাবতা যাচাইয়ের জন্য মুলাদী এবং বাবুগঞ্জ ভিজিট করেছে। সম্ভাব্যতা যাচাই পরবর্তী আমরা যৌথ তদন্তে নামব। আশা করছি আগামী ১৫-২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যৌথ তদন্তটা শেষ করতে পারব। এরপরই পুরোপুরি প্রস্তাবটা তৈরি করা যাবে। তখন নিশ্চিত হওয়া যাবে কী পরিমাণ জায়গা আমাদের অধিগ্রহণ করতে হতে পারে।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগ বরিশাল সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মাসুদ খান বলেন, ‘গত অক্টোবরে ব্রিজের ভিম তৈরির কাজ দৃশ্যমাণ হওয়ার কথা ছিল। তবে ডিজাইনের কারণে একটু বিলম্ব হচ্ছে। আশা করছি আগামী নভেম্বরে ব্রিজের ডিজাইনটা অনুমোদন হবে। এরপর ডিসেম্বরেই ব্রিজ নির্মাণ কাজ দৃশ্যমান হবে।’