মো: আম্মার হোসেন আম্মার :: দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মরণ নেশা ইয়াবা : ধ্বংসের পথে যুব সমাজ, বাড়ছে খুন, ধর্ষণ, চুরি-ছিনতাই
দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মরণ নেশা ইয়াবার বিস্তার। সীমান্ত এলাকা থেকে শুরু করে শহর ও গ্রাম—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ছে এই ভয়ঙ্কর মাদক। উদ্বেগজনক হারে তরুণ ও কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকাসক্তিতে। ফলে দিন দিন বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক অশান্তি, অপরাধ প্রবণতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবনতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবার ভয়াবহ প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তিকেই ধ্বংস করে না, এটি ধীরে ধীরে পুরো পরিবার ও সমাজকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইয়াবা বর্তমানে দেশের যুব সমাজের জন্য এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। মাদকাসক্তির কারণে বাড়ছে খুন, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বহু অপরাধের পেছনে মাদকাসক্তির সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ইয়াবা সেবনের ফলে একজন মানুষ ধীরে ধীরে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং তার চিন্তা-চেতনা ও আচরণে ভয়াবহ পরিবর্তন দেখা দেয়।
মাদকের ভয়াবহতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে নেশার টাকা না পেয়ে নিজের বাবা-মাকেও হত্যা করতে দ্বিধা করছে না মাদকাসক্ত সন্তান। ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকের আসক্তি একজন মানুষকে ধীরে ধীরে বিবেকহীন ও হিংস্র করে তোলে। নেশার চাহিদা পূরণে তারা পরিবার, সম্পর্ক, ভালোবাসা—সবকিছু ভুলে গিয়ে জড়িয়ে পড়ছে খুন, নির্যাতন, চুরি-ছিনতাইসহ ভয়াবহ অপরাধে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক শুধু শরীর নয়, মানুষের মনুষ্যত্ব ও পারিবারিক বন্ধনকেও ধ্বংস করে দেয়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, দীর্ঘদিন ইয়াবা সেবনের ফলে একজন মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিক রাগ, হিংস্রতা, অস্থিরতা, অতিরিক্ত উত্তেজনা, সন্দেহপ্রবণতা ও মানসিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্ত ব্যক্তি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন কিংবা সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধ ও মানবিক অনুভূতি কমতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় মায়া, মমতা, ভালোবাসা, বিশ্বাস, নম্রতা, ভদ্রতা, সততা ও সময়ানুবর্তিতার মতো মূল্যবান মানবিক গুণাবলি।
সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমানে তরুণদের একটি বড় অংশ সহজে বিলাসী জীবনযাপনের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসিতার প্রতিযোগিতা, অবাধ অর্থব্যয়, পারিবারিক নজরদারির অভাব এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি তরুণদের ভুল পথে পরিচালিত করছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের সময় না দিয়ে শুধুমাত্র অর্থ ও ভোগ-বিলাসের সুযোগ করে দিচ্ছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে তরুণদের মাদকাসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সচেতন মহল বলছে, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। এজন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, নৈতিক শিক্ষা দেওয়া এবং সৎ পথে উপার্জিত অর্থে সাধারণ ও মিতব্যয়ী জীবনযাপনে অভ্যস্ত করাও অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, দেশে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে বড় মাদক কারবারিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে সহজেই যুব সমাজের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য। সচেতন নাগরিকরা মাদক নির্মূলে পুলিশের আরও কঠোর ও জিরো টলারেন্স নীতির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, মাদক ব্যবসায়ী ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই ভয়াবহ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
পরিবারে ভালোবাসা, সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনাই পারে একজন সন্তানকে মাদক, অপরাধ ও নানা আসক্তি থেকে দূরে রাখতে। একটি সুস্থ, সুন্দর ও মানবিক সমাজ গঠনে এখনই মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।