নিউজ ডেস্ক :: নদীই যাদের জীবন, নদীর বুকেই যাদের বেড়ে ওঠা, সেই মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষের মৃত্যুর পর দাফনের স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে বরিশাল সদর উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফরিদা সুলতানার উদ্যোগে এবং টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগিতায় মান্তা সম্প্রদায়সহ ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে একটি কবরস্থান। বরিশাল সদর উপজেলার সিংহেরকাঠী আশ্রয়ণ প্রকল্পসংলগ্ন খাসজমিতে প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে কবরস্থানটির কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে নদীকেন্দ্রিক জীবনযাপন করে আসছেন বরিশাল সদর উপজেলার লাহারহাট, চরবাড়িয়া ও আশপাশের নদ-নদীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করা মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নদীকে ঘিরেই তাদের জীবন-জীবিকা। নদীতে জন্ম, নদীর পানিতে বেড়ে ওঠা আর নদীর বুকেই জীবনের অধিকাংশ সময় কাটে তাদের। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে প্রিয়জনের মরদেহ কোথায় দাফন করবেন, সেই অনিশ্চয়তা দীর্ঘদিন ধরে তাদের তাড়া করে ফিরেছে।
জীবন-জীবিকার নানা সংকটের পাশাপাশি মৃত্যুর পর শেষ আশ্রয়স্থলটুকু না থাকার কষ্ট ছিল এই সম্প্রদায়ের মানুষের অন্যতম বড় বেদনা। স্থায়ী কবরস্থান না থাকায় অনেক সময় মৃত ব্যক্তির মরদেহ দাফন করা নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হতো স্বজনদের। এমনকি কবরস্থানের অভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার মতো হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অসহায়ত্ব ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে একটি স্থায়ী কবরস্থানের প্রত্যাশা ছিল তাদের।
মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষের এই দীর্ঘদিনের সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে বরিশাল সদর উপজেলা প্রশাসন কবরস্থান নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগিতায় সিংহেরকাঠী আশ্রয়ণ প্রকল্পসংলগ্ন একটি খাসজমিতে কবরস্থান নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশা, অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে কবরস্থানটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা সম্ভব হবে।
উদ্যোগটির বিশেষ দিক হলো, কবরস্থানটি শুধু মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমাজের ছিন্নমূল, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত যেকোনো মানুষের দাফনের জন্য এটি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সমাজের অন্য অসহায় মানুষেরও মৃত্যুর পর সম্মানজনকভাবে দাফনের সুযোগ তৈরি হবে।
বরিশাল সদর উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্থানীয়ভাবে একটি মানবিক ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, মানুষের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা শুধু জীবদ্দশায় সীমাবদ্ধ নয়, মৃত্যুর পর সম্মানজনক বিদায়ের সুযোগ নিশ্চিত করাও মানবিক দায়িত্বের অংশ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদা সুলতানার নেতৃত্বে নেওয়া এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষের দীর্ঘদিনের একটি বড় দুশ্চিন্তার অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে।
মানবিকতার জয় হোক—নদীর বুকে যাদের জীবন কেটেছে, মৃত্যুর পর অন্তত এক টুকরো মাটিতে যেন সম্মানের সঙ্গে চিরনিদ্রায় শায়িত হতে পারেন, এই উদ্যোগ সেই প্রত্যাশাকেই বাস্তবতার পথে এগিয়ে নিচ্ছে।