আহমেদ বায়েজিদ :: অভিযোগ পেলেই নড়েচড়ে বসেন। প্রয়োজন হলে অপেক্ষা না করে ছুটে যান ঘটনাস্থলে। সরকারি দপ্তরে দায়িত্বে গাফিলতি চোখে পড়লে নেওয়া হয় তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। কোথাও কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থলে অনুপস্থিত, কোথাও সরকারি নথি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, আবার কোথাও দায়িত্ব পালনে অনিয়ম—কোনো বিষয়ই যেন তাঁর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে না। ফলে বরিশাল বিভাগে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে কঠোর অবস্থানের নতুন বার্তা দিচ্ছেন বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ। ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চরিত্র ‘ফাটাকেষ্ট’ যেমন অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তেমনি বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডেও দেখা যাচ্ছে অভিযোগে দ্রুত সাড়া, সরেজমিনে যাচাই এবং অনিয়মের প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা। এ কারণেই রূপক অর্থে প্রশাসনিক মহলে তাঁর কর্মকাণ্ডকে ‘ফাটাকেষ্টের ভূমিকায়’ বলে আলোচনা হচ্ছে। ২০তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. খলিল আহমেদকে ২২ এপ্রিল ২০২৬ বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভাগের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমে নজরদারি বাড়িয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ভূমি অফিসগুলোতে তাঁর আকস্মিক পরিদর্শন ইতোমধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিদর্শনের সময় শুধু অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নয়, সরকারি নথিপত্র, মামলার প্রতিবেদন, অফিস পরিচালনা, সেবাপ্রার্থীদের সেবা প্রদান এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলোও সরেজমিনে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে নেওয়া হচ্ছে প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ জুলাই বানারীপাড়ার বিশারকান্দি ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা আছমা আক্তারকে আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ২৭ জুলাই সরকারি খাসজমি নিয়ে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় হিজলার ধুলখোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা শঙ্কর চন্দ্র মালাকারকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়। এদিকে পটুয়াখালীর ছয় ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বছরের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) পরিবর্তনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়েছে। শাস্তির মেয়াদে তাদের পদোন্নতির জন্য বিবেচিত না করার কথাও জানানো হয়েছে।
দেওয়ানি মামলার প্রতিবেদন ও দফাওয়ারি জবাব দাখিলে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগেও নেওয়া হয়েছে ব্যবস্থা। নলছিটির আঃ মালেককে একাধিকবার তাগিদ দেওয়ার পরও দেওয়ানি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন যথাসময়ে দাখিল না করায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগে নলছিটির মো. সরোয়ার হোসেনকেও শোকজ করা হয়েছে। অন্যদিকে কলাপাড়ার মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মো. আসিফ নূরকে নয়টি দেওয়ানি মামলার দফাওয়ারি জবাব দিতে এক বছরের বেশি সময় কালক্ষেপণের অভিযোগে ৩১ আগস্ট কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনা ঘটে ৮ সেপ্টেম্বর রাজাপুরের শুক্তাগড় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। সকাল ৯টার দিকে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে বিভাগীয় কমিশনার দেখেন, অফিসে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই; এমনকি অফিসের দরজাতেও তালা ঝুলছে। পরে স্থানীয় এক দপ্তরি এসে তালা খুলে দেন। পরিদর্শনের সময় ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন খানও কর্মস্থলে ছিলেন না। এ ঘটনায় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এর পরদিনই আজ ৯ সেপ্টেম্বর সকালে বরিশাল সদর উপজেলার আমানতগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শন চালানো হয়। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. ওবায়দুল্লাহ সেখানে গিয়ে উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা শিমুল পাইন শান্তা ও অফিস সহায়ক মো. মজিবুর রহমানকে কর্মস্থলে পাননি। নির্ধারিত সময়ে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে একই দিন দুজনকেই বদলি করে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) করা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, বরিশাল বিভাগের ৬ জেলার ২৫৪টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি, সেবা প্রদানের মান এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে বিভাগীয় প্রশাসনের। বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ এই মনিটরিং ও আকস্মিক পরিদর্শন কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট সময় বা আগাম নোটিশ ছাড়াই যেকোনো দিন, যেকোনো মুহূর্তে বিভাগের বিভিন্ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, দায়িত্ব পালনে অবহেলা কিংবা সরকারি সেবা প্রদানে অনিয়মের অভিযোগ এখন গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের এই ধারাবাহিক তৎপরতায় সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে জবাবদিহিতার চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও একই—সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে থাকবেন, সেবাপ্রার্থীরা হয়রানি ছাড়া সেবা পাবেন এবং সরকারি নথি ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় থাকবে স্বচ্ছতা।
বিভাগীয় প্রশাসন সূত্রের ভাষ্য, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি দপ্তরে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি কিংবা অনিয়ম কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না—এমন কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন বিভাগীয় কমিশনারের মূল দায়িত্বের অন্যতম হলো তাঁর অধীনস্থ প্রশাসনিক কার্যক্রমের তদারকি করা। তবে সেই তদারকি যখন নিয়মিত অফিস পরিদর্শন, অভিযোগের দ্রুত অনুসন্ধান এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থায় রূপ নেয়, তখন মাঠপর্যায়ে জবাবদিহিতার পরিবেশ তৈরি হয়। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও একই—সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সময়মতো অফিস করবেন, জনগণ হয়রানি ছাড়া সেবা পাবেন এবং সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রকল্পে থাকবে স্বচ্ছতা। সেই প্রত্যাশার সঙ্গে প্রশাসনিক উদ্যোগের সমন্বয় ঘটাতে মাঠে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ। অভিযোগকে ফাইলে আটকে না রেখে সরেজমিনে যাচাই, দায়িত্বে অবহেলা দেখলে ব্যবস্থা এবং সরকারি কাজের ওপর নিয়মিত নজরদারি—এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বরিশাল বিভাগে তিনি যে বার্তাটি দিতে চাইছেন তা স্পষ্ট: সরকারি দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অনিয়মের সুযোগ নেই। আর এই কঠোর অবস্থানের কারণেই গত কয়েক মাসে বরিশালের প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছেন মো. খলিল আহমেদ। তাঁর কার্যক্রম নিয়ে তাই অনেকের মুখেই এখন রূপক অর্থে শোনা যাচ্ছে—‘ফাটাকেষ্টের ভূমিকায় বিভাগীয় কমিশনার’। বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনকে বলেন, সরকারি দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, নথি বা মামলা নিষ্পত্তিতে অযথা বিলম্ব এবং সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জনগণকে সেবা দিতে হবে। কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করা হবে এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগাম নোটিশ ছাড়াই বিভিন্ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শন অব্যাহত থাকবে। সরকারি দায়িত্বকে জনগণের সেবা হিসেবে বিবেচনা করে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।