
বরিশাল নগরীতে দিন দিন বাড়ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা। নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, বাজার, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনেও এসব যানবাহনের অবাধ চলাচল ও যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকার কারণে বাড়ছে যানজট। একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং সড়কে শৃঙ্খলা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। নগরবাসীর অভিযোগ, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব যানবাহন এখন নগরজীবনের অন্যতম বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বরিশাল নগরীতে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার অটোরিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করছে। অথচ বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে করপোরেশনের অনুমোদিত ইজিবাইকের সংখ্যা ৭ হাজার ৬১০টি। এই দুই হিসাবের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় নগরীতে কতটি যানবাহন চলাচল করছে, কতটির বৈধ অনুমোদন রয়েছে এবং কীভাবে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এদিকে যানজট ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে অনুমোদিত ইজিবাইকের লাইসেন্স নবায়ন করছে সিটি করপোরেশন। অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান ও জরিমানার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বর্তমান প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন দায়িত্ব নেওয়ার পর যানবাহন ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তবে এসব উদ্যোগের মধ্যেই অনুমোদন ও লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন চালকের দাবি, নতুন অনুমোদন পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তাঁদের কাছে টাকা চাওয়া হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
রূপাতলী থেকে নথুল্লাবাদ রুটে চলাচলকারী কয়েকজন ইজিবাইক চালক অভিযোগ করেছেন, বরিশাল নগরীর স্থানীয় বাসিন্দা হয়েও তাঁরা এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের অনুমোদন পাননি। অথচ তাঁদের দাবি, আগৈলঝাড়া ও বানারীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার অনেক ইজিবাইক অনুমোদন নিয়ে নগরীতে চলাচল করছে।
ইজিবাইক চালক ইউনুস মৃধা, আকবর হোসেনসহ কয়েকজনের অভিযোগ, অনুমোদনের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে গাড়িপ্রতি কয়েক হাজার টাকা দিলে অনুমোদনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, নিয়ম মেনে অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় তাঁরা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
তবে কারা টাকা দাবি করেছেন, তাঁদের পরিচয় কী এবং এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে কি না—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
চালকদের অভিযোগের পাশাপাশি অনুমোদিত যানবাহনের সংখ্যা ও নবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। নগরবাসীর মতে, নির্ধারিত ফি, আবেদনকারীদের তালিকা, নবায়নের রশিদ এবং অনুমোদনের টোকেনসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে। একই সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করা প্রয়োজন।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের যানবাহন শাখার কর্মকর্তা মানিক হোসেন জানান, সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর সময়ে নতুন করে ২ হাজার ৫০০ ইজিবাইকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে নগরীতে সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত ইজিবাইকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ হাজার ৬১০টি।
তিনি জানান, বর্তমান প্রশাসন পুরোনো অনুমোদনের আওতায় থাকা ইজিবাইকগুলোর লাইসেন্স নবায়ন করছে। নতুন করে কোনো ইজিবাইক বা সিএনজিচালিত যানবাহনের অনুমোদন দেওয়া হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সিটি করপোরেশনের এই বক্তব্যের সঙ্গে চালকদের অভিযোগের পার্থক্য থাকায় অনুমোদন ও নবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন অনুমোদন দেওয়া না হলে টাকা দিয়ে অনুমোদন পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কারা দিচ্ছেন, আর পুরোনো অনুমোদনপ্রাপ্ত গাড়ির লাইসেন্স নবায়ন কীভাবে হচ্ছে—তা পরিষ্কার করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরীর সদর রোড, রূপাতলী, নথুল্লাবাদ, চৌমাথা, হাসপাতালসংলগ্ন সড়ক ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে প্রায়ই অটোরিকশা ও ইজিবাইকের জটলা দেখা যায় বলে অভিযোগ নগরবাসীর। অনেক চালক নির্ধারিত স্থান না মেনে সড়কের পাশে বা ব্যস্ত মোড়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখেন। একই রুটে অতিরিক্ত যানবাহন চলাচল এবং যেখানে-সেখানে গাড়ি থামানোর কারণে অন্যান্য যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, ব্যস্ত সড়কে অটোরিকশা ও ইজিবাইকের চলাচল নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় একদিকে যেমন যানজট বাড়ছে, অন্যদিকে পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও বাজার এলাকায় যানবাহনের চাপ বেশি থাকায় জরুরি প্রয়োজনে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তাঁদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে বা জরিমানা করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নগরীতে কতটি যানবাহন চলবে, কোন রুটে চলবে, কোথায় যাত্রী ওঠানো-নামানো করবে এবং কোথায় পার্কিং করবে—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
নগর চিন্তাবিদ কাজী মিজানুর রহমান বলেন, অনেক অটোরিকশা চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। সহজে উপার্জনের সুযোগ হিসেবে অনেকে নগরীতে এসে এসব যানবাহন চালানো শুরু করেন। এতে সড়কের নিয়মকানুন না জানা এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণে দক্ষতার অভাবের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, অটোরিকশার মতো যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা এবং নিরাপদে গাড়ি চালানোর দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে। তাঁর মতে, দুর্ঘটনায় অনেকে গুরুতর আহত হয়ে হাত-পা ভাঙাসহ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় পড়ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চালকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি যানবাহনের ফিটনেস, ব্রেক, লাইট, ব্যাটারি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নিয়মিত পরীক্ষা করাও জরুরি। একই সঙ্গে চালকদের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান বলেন, জনবল সংকটের কারণে সদর রোডের সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য সড়কগুলো পুরোপুরি নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কিছু অটোরিকশা সদর রোডে প্রবেশ করছে।
তিনি জানান, এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দেওয়া হচ্ছে। তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা না থাকায় কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তারপরও অটোরিকশা যাতে সদর রোডে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।
ট্রাফিক পুলিশের বক্তব্যে জনবল সংকটের বিষয়টি উঠে এলেও নগরবাসীর প্রত্যাশা, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সংযোগ সড়কগুলোতে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হবে, যাতে একই ধরনের যানবাহনের চলাচল নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশনা বা নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি না থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরিশাল নগরীর যানজট ও দুর্ঘটনা কমাতে হলে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। নগরীর সড়কের ধারণক্ষমতা বিবেচনা করে কতটি অটোরিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করতে পারবে, কোন রুটে চলবে এবং কোথায় দাঁড়াবে—তা নির্ধারণ করতে হবে।
একই সঙ্গে অনুমোদন ও নবায়নের ক্ষেত্রে গাড়ির প্রকৃত মালিকানা, স্থায়ী ঠিকানা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং নির্ধারিত ফি যাচাই করে স্বচ্ছ তালিকা তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা। অনুমোদিত যানবাহনের পরিচিতি সহজে যাচাই করা যায়, এমন ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে। এতে অনুমোদনহীন যানবাহন শনাক্ত করা এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করা সহজ হবে।
নগরবাসীর দাবি, ব্যস্ত সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নির্দিষ্ট স্টপেজ ও পার্কিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত অভিযান জোরদার করতে হবে।
বরিশাল নগরীর মানুষের প্রত্যাশা, যানজট নিরসন ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন এবং ট্রাফিক পুলিশ দ্রুত সমন্বিত কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে অনুমোদন ও লাইসেন্স নবায়ন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যথায় দিন দিন বাড়তে থাকা অটোরিকশা ও ইজিবাইকের চাপ নগরীর স্বাভাবিক চলাচলকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।