নিজস্ব প্রতিবেদক :: একদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, অন্যদিকে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বিদ্যুৎ বিল। এই দুই সংকটে দেশের সাধারণ মানুষ এখন চরম ভোগান্তির মুখে। জুলাই মাসে হাতে পাওয়া জুনের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিদ্যুৎ অফিস এবং ভোক্তাদের মধ্যে চলছে তীব্র আলোচনা ও ক্ষোভ। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, একই ধরনের ব্যবহার থাকা সত্ত্বেও একমাসের ব্যবধানে তাদের বিদ্যুৎ বিল ২০ শতাংশ থেকে শুরু করে দুই, তিন এমনকি চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। উচ্চতর স্লাব এজন্য দায়ী বলছেন বেশিরভাগ গ্রাহক। এই স্লাব সিস্টেম বাতিলের দাবি সাধারণ মানুষের। আর বাড়তি বিদ্যুৎ বিল মিটারের সমস্যা দাবী কর্তৃপক্ষের।
বরিশালের এক গ্রাহকের হাতে থাকা দুটি বিদ্যুৎ বিল পর্যালোচনায়ও অসঙ্গতির ইঙ্গিত মিলেছে। মে মাসে যেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহার দেখানো হয়েছে ১৮০ ইউনিট সেখানে জুন মাসে তা বেড়ে ২৪৫ ইউনিট দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ৬৫ ইউনিট বেশি ব্যবহারের বিপরীতে মোট বিল বেড়েছে প্রায় ৬৮২ টাকা। গ্রাহকের প্রশ্ন, প্রকৃতপক্ষে এত বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও অতিরিক্ত ইউনিট কীভাবে যোগ হলো? একই ধরনের অভিযোগ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও উঠছে।
সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট আনিস ইউ খান তার ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, জুন মাসের বিদ্যুৎ বিলে অতিরিক্ত চার্জ যেন প্রতি বছরের একটি নিয়মিত চিত্র। তিনি লেখেন, পিডিবি, ডেসকো বা পল্লী বিদ্যুৎ জুন মাসে গ্রাহকের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে তাদের বার্ষিক টার্গেট পূরণ করে। বিদ্যুৎ চুরি বা সিস্টেম লস বন্ধ না করে নিয়মিত বিল পরিশোধকারী গ্রাহকদের ওপরই বাড়তি বিলের বোঝা চাপানো হয়। অভিযোগ করলে বলা হয়, এবার বিল দিয়ে দিন, পরের মাসে সমন্বয় করা হবে।”
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, তার ভবনের কমন বিদ্যুৎ বিল এক মাসে ১৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫৬ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। ব্যক্তিগত ফ্ল্যাটের বিলও প্রায় ২০ শতাংশ বেশি এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। তার প্রশ্ন, যে বিদ্যুৎ আমরা ব্যবহার করিনি, তার বিল কেন দেব? বিদ্যুৎ চুরি বা সিস্টেম লসের দায় সাধারণ গ্রাহক বহন করবে কেন?”
বিদ্যুৎ বিভাগ দাবি করেছে, জুন মাসে কার্যকর হওয়া নতুন ট্যারিফ এবং গরমের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক গ্রাহক উচ্চতর স্ল্যাবে চলে গেছেন। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, অধিকাংশ বিল বৃদ্ধি নতুন ট্যারিফ ও বেশি ব্যবহারের কারণে হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে করণিক ভুল হয়েছে, যা যাচাই করে সংশোধন করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
তবে উচ্চতর স্ল্যাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ গ্রাহকদের আপত্তি রয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবহার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলেই পরবর্তী স্লাবের বেশি ইউনিট মূল্য কার্যকর হওয়ায় বিল হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়। ভোক্তাদের অভিযোগ, এটি এমন একটি কাঠামো যেখানে সীমা অতিক্রমের পর বিল দ্রুত বাড়তে থাকে, ফলে অল্প ব্যবহারের অতিরিক্ত বৃদ্ধিতেও মোট বিলের ওপর বড় প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক ট্যারিফ পুনর্বিন্যাস নিয়েও বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষক মধ্যম আয়ের গ্রাহকদের ওপর এর বাড়তি চাপের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ মিটার রিডিং না নিয়েই অতিরিক্ত ইউনিট যোগ করে বিল তৈরি করা হয়েছে। আবার অনেক গ্রাহকের প্রশ্ন, যখন দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হয়েছে, তখন বিদ্যুৎ ব্যবহার এত বেশি হলো কীভাবে? মাঠ পর্যায়ের বিদ্যুৎ পরিদর্শক বা সহকারী প্রকৌশলীরা তখন গ্রাহকদের প্রিপেইড মিটার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন।
অন্যদিকে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো ১) বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুর কুমার স্বর্ণকার বলেন, “কোনো অতিরিক্ত বিল করা হয়নি। মিটারে যে পরিমাণ ইউনিট রেকর্ড হয়েছে, সে অনুযায়ীই বিল করা হয়েছে।” প্রিপেইড মিটার চালুর বিষয়ে তিনি জানান,”বরিশালে প্রিপেইড মিটার চালুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পরিকল্পনা নেই।”
তিনি আরো বলেন, উচ্চতর স্ল্যাব সাধারণ গ্রাহকতো এর আওতায় আসার কথা নয়। ৭৫ ইউনিটের পর উচ্চতর স্ল্যাব হবে। একজন সাধারণ গ্রাহকের জন্য ৭৫ ইউনিট হওয়াইতো অস্বাভাবিক। তাছাড়া এই স্ল্যাবতো আগে থেকেই ছিলো। এগুলো সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে তবেই নির্ধারণ করে। এসময় তিনি বিদ্যুৎ এ স্বনির্ভর হওয়ার উপর গুরুত্ব দিয়ে উইন্ডমিল, বায়োগ্যাস ও সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার সহজ করতে গবেষণা ও উৎপাদন এবং এ বিষয়ে বুয়েটের ভূমিকা নিয়েও মন্ত্রী আলোচনা করবেন বলে জানান।
যদিও জ্বালানি খাত বিশ্লেষকদের মতে, যখন একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একই ধরনের অভিযোগ উঠে আসে, তখন কেবল “ব্যবহার বেড়েছে”- এই ব্যাখ্যায় বিতর্ক শেষ হয় না। মিটার রিডিং, বিল প্রস্তুতের সফটওয়্যার, সিস্টেম লস, ওভার বিলিংয়ের অভিযোগ এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করে প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে যেমন প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে, তেমনি গ্রাহকদের আস্থাও ফিরবে।