আহমেদ বায়েজিদ :: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সাউদার্ন কান্ট্রি আয়রন ব্রিজ রিকন্সট্রাকশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্ট (আইবিআরপি)-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও বরিশাল অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরীফ মো. জামাল উদ্দিন (অলোক)-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব অভিযোগ করেছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় কিছু অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রাক্কলন অনুমোদন, এপিপি, টেন্ডার অনুমোদন, বিল পরিশোধ এবং অর্থ বরাদ্দ বিভিন্ন ধাপে কমিশন ছাড়া ফাইল অগ্রসর হয় না। তাদের ভাষ্য, এসব কমিশন আদায়ের ক্ষেত্রে বরিশাল এলজিইডির এক সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শিপলু কর্মকার সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি। কয়েকজন ঠিকাদার আরও দাবি করেন, ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কিছু কাজেরও প্রাক্কলন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীরা ঝালকাঠি ও বরগুনার কয়েকটি সেতু প্রকল্পের নথির উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, সংশ্লিষ্ট অনুমোদন ও ডিপিপির মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথি সরকারি পর্যায়ে নিরপেক্ষভাবে যাচাই প্রয়োজন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বরিশাল অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও (আইবিআরপি)-এর প্রকল্প পরিচালক হিসাবে ৬টি জেলার দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ জামাল উদ্দিন (অলোক)। এসব জেলাগুলো হলো বরিশাল-ঝালকাঠী-পিরোজপুর-ভোলা-পটুয়াখালী-বরগুনা। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে এই জেলাগুলোর গ্রামীণ ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, রাস্তাঘাট ও কালভার্ট নির্মাণ এবং এলজিইডির চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর তদারকির মূল দায়িত্বে তিনি রয়েছেন। এছাড়াও তিনি এলজিইডির নির্দিষ্ট কিছু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও কেন্দ্রীয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। একাধিক গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালনের কারনে তিনি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছেন বলে একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে ৬% কমিশন ছাড়া তিনি কোন কাজ করেন না। অনুসন্ধান করে জানাগেছে, শরিফ মোঃ জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তিনি প্রাক্কলন অনুমোদনের সময় ২%, এপিপি সময় ১%, টেন্ডার অনুমোদনের সময় ১%, কাজের বিলের সময় ১% এবং অর্থ বরাদ্দের সময় ১% টাকা না দিলে কোন অর্থ বরাদ্দ মেলে না তার কাছ থেকে। তার কমিশন আদায়ের দায়িত্বে রয়েছেন বরিশাল এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শিপলু কর্মকার। বরিশাল-ঝালকাঠী-পিরোজপুর-ভোলা-পটুয়াখালী-বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলীদের কাছে ঠিকাদাররা কোন বিলের কথা বললে তারা বলেন, প্রকল্প পরিচালক মোঃ জামাল উদ্দিন (অলোক) স্যারের সাথে কথা বলেন। গোপন সূত্রে জানাগেছে, প্রকল্প পরিচালক নিজে প্রাক্কলন তৈরী করে সে তার লোকজন’কে উচ্চ কমিশনের মাধ্যমে বিক্রি করেন। শুধু তাই নয় সে যে কোন কাজের সময় বর্ধন করতে হলে তাকে ১টি তে ২৫০০০ টাকা করে দিতে হয়। এছাড়া যে কোন স্কীমের রিকাষ্ট করার সময় তাকে অনেক বড় অংকের টাকা দিতে হয়। তিনি নলছিটি ব্রীজের ২৮নং কাজের জন্য ১জনের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে বিক্রি করে তার প্রাক্কলন মূল্য ৬৫.৬৫২ লক্ষ টাকা দিতে হয়। ঝালকাঠি জেলা বাজাপুর উপজেলা বিআরজি ১০ আইডি ৫৪২৮৪৩০১২-(আইডি ৫৪২৮৪৩০১২-১১) ডিপিপিতে কোন আর্থ বরাদ্দ নাই, তিনি ডিপিপির বাহিরে অনুমোদন করেছে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে নিয়ম আমান্য করে প্রাক্কলন অনুমোদন করেছেন। ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলা বিআরজি ৩২ আইডি৫৪২৭৩ ৪১৬৫-২৫ মিটার ব্রিজ ডিপিপিতে না থাকা স্বত্ত্বেও প্রধান প্রকৌশলী নথিতে উল্লেখ করেন প্রাক্কলিত মূল্য ডিপিপি মূল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহন করতে বলা থাকলেও মোঃ জামাল উদ্দিন এসবের তোয়াক্কা করেনি, প্রাক্কলন অনুমোদন করেছেন। যে সকল স্কীমের ডিপিপি অন্তর্ভুক্ত নাই তিনি সে সকল স্কীমকে অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে ৬% কমিশনের বিনিময়ে। তিনি কাউকে তোয়াক্কা করেন না। তিনি বলেন তার নাম অলক, তার কাছে নাকি নগদ টাকা দিলে তিনি সব করতে পারেন বলে বুলি উড়ায়। বরগুনা জেলা সদর উপজেলায় পেকেজ নাম্বার বিআরজি-৫-৩৩ এম পেকেজ নাম্বার বিআরজি-৬-৪৬ এম ব্রীজের চুক্তি ছিলো ৭ (সাত) কোটি টাকা কিন্তু তিনি (পিডি) শুধু রাস্তার জন্য নিজে প্রাক্কলন তৈরী করে ৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত তার নিজের লোকের মাধ্যমে কমিশন নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে যার ডিপিপি’তে কোন টাকা ছিলো না। শুধু তাই নয় টেন্ডারে একজনের কাজ ৫% বিনিময় করে মূল্যায়ন ও পুনঃমূল্যায়ন করতে পাঠাইতে বলে তার কমিশন ছাড়া কিছুই হয় না। তিনি প্রায় অর্ধ যুগের কাছাকাছি বিভিন্ন পদে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বরিশালে চাকরি করে যাচ্ছেন। জানাগেছে, (আইবিআরপি) প্রকল্পের আওতায় বরিশাল জেলার সকল উপজেলায় ২৫৮টি আয়রন ব্রীজ অনুমোদন করেন। যার মধ্যে ১৯৮ টি ব্রীজের গ্যালবেনাইজিং রং করার জন্য সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী বোরহানউদ্দনকে বলা হলেও তিনি মূলত ৫৪টি ব্রীজে খুবই নিম্নমানের রং ব্যবহার করেন যার পেকেজ নং আইবিআরপি/বারি/এইচআইজেড/রিহ্যাব/বিআরজি-৯৪, আইডি নং-৫০৬৩৬৫০১৫/২৫ মিটার ব্রীজ আইবিআরপি/বারি/এইচআইজেড/রিহ্যাব/বিআরজি-৯৫, আইডি নং-৫০৬৩৬৪০২০/৩৫ মিটার ব্রীজ বিআরজি-৯৫-১৪৯ নং পেকেজ পর্যন্ত অবশিষ্ট ব্রীজগুলোতে ও নিম্ন মানের রং ব্যবহার দায়সারা করে কাজ বুঝিয়ে দেন। ঠিকাদারের সাথে হাত মিলিয়ে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেছে। একাধিক অসমর্থিত সূত্র নিশ্চিত করেছে মোঃ জামাল উদ্দিন (অলোক) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লার ঘনিষ্ট ও তার নির্বাচনী এলাকায় গৌরনদী, আগৈলঝাড়া, বনারীপাড়া উপজেলায় প্রতি ব্রীজে একজনকে কাজ দিয়ে ৫% কমিশন বানিজ্য করেছেন। ঐ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নাম কহিনুর এন্টারপ্রাইজ। মোঃ জামাল উদ্দিন (অলোক) হাসানাত আবদুল্লাহ ঘনিষ্ট হওয়ার সত্ত্বেও কিভাবে গুরুত্বপূর্ন চেয়ারে এখনো বহাল আছে এমন প্রশ্ন বিভিন্ন মহলের। এছাড়া বরিশাল জেলার গৌরনদী ও বানারীপাড়া উপজেলার যে সকল ব্রীজের স্কীম অনুমোদন করেছেন সেই সকল ব্রীজের কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২২ সালে। সেই প্রকল্পের কাজ বাতিলের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী চিঠি দিলেও পিডি সে কাজ বাতিলের বিষয়টি নকচ করে দেয়। কমিশনের বিনিময়ে উল্টো কাজ বাস্তবায়নের জন্য চিঠি প্রেরণ করেন পিডি। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় বিষয়টি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক শরীফ মো. জামাল উদ্দিন (অলোক) ও বরিশাল এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শিপলু কর্মকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।