নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে ডেঙ্গুর হানা ৬ জেলায় আক্রান্ত সাড়ে ৬ হাজার, মৃত্যু ৯।
চলতি বছর বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার মধ্যে দুই জেলায় সর্বাধিক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী- সব থেকে বেশি পিরোজপুরে ১ হাজার ৭৭৭ জন এবং ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৫৭৯ জনসহ বরিশাল বিভাগে মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৫৬০ জন। তবে আক্রান্ত এসব রোগীর মধ্যে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৩৯৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে বরিশালে ১০১ জন, পিরোজপুরে ৯২, ঝালকাঠিতে ৪৯, পটুয়াখালীতে ৫৯, বরগুনায় ৬৬ এবং ভোলায় ২৬ জন আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বরিশালের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। আর জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন হাসপাতালের মধ্যে পিরোজপুরে ৩৬, ঝালকাঠিতে ২২ পটুয়াখালীতে ২১, বরগুনায় ১৭ এবং ভোলায় আরও ৬ জনসহ মোট ১৩২ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এ ছাড়াও বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বরিশালে ১ হাজার ৯৬ জন, পিরোজপুরে ১ হাজার ৭৭৭, ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৫৭৯, পটুয়াখালীতে ৮৮৩, বরগুনায় ৮৮৮ এবং ভোলায় ৩৩৭ জনসহ মোট ৬ হাজার ৫৬০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্ত এ সব রোগীদের মধ্যে ৬ হাজার ১৫৮ জন রোগীই চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বরিশালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ জনসহ পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে ১ জন করে মোট ৯ জনের মৃত্যুর হয়েছে।
বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার মধ্যে গত বছর বরগুনায় ব্যাপক সংখ্যক মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও এ বছর সেই চিত্র ভিন্ন। গত বছরের শুরু থেকে ওই বছরের এই সময় পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও এ বছর এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র ৮৮৮ জন। এ ছাড়াও গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এ বছর বরগুনায় এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ও জনসাধারণের সচেতনতার কারণেই গত বছরের ডেঙ্গুর হটস্পট বরগুনায় এ বছর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানিয়ে বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, গত বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা থেকে এ বছর আমারা আগাম প্রস্তুতি নিয়েছি। এর মধ্যে মানুষ যাতে আক্রান্ত না হয়, সে কারণে চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন এবং পৌরসভার সংশ্লিষ্টদের বলেছি এবং প্রচার প্রচারণাসহ স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজনও মানুষকে সচেতন করেছি। জেলা প্রশাসন এবং পৌরসভা থেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে। তবে যাদি তাদের কাজের মাত্রা আরও একটু বাড়িয়ে করা যায়, তাহলে আমরা আরও বেশি স্বস্তিতে থাকতো পারবো।
গত বছর বরিশাল বিভাগের মধ্যে বরগুনা জেলাকে ডেঙ্গুর হটস্পট ঘোষণা করা হলেও এ বছর আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটাই কম। তবে এ বছর নতুন করে বিভাগের মধ্যে পিরোজপুরে সর্বাধিক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। প্রতিদিন প্রায় ২৫-৩০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এতে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট পিরোজপুর সদর হাসপাতালটিতে প্রতিদিন শুধু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েই শতাধিক রোগীকে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বর্তমানে ১০০ শয্যার ওই হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে তিন শতাধিকেরও বেশি রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আর এ কারণে পর্যাপ্ত বেড ও চিকিৎসক সংকটে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের। অপরদিকে এত সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের।
পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভার্তি থাকা রহিমা বেগম নামে এক রোগীর স্বজন সজল হাবিবুর রহমান বলেন, আমার চাচি রহিমা বেগম ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। চিকিৎসা ভালো হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জায়গার সংকট। রোগী বেশি থাকায় হাসপাতালের মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। হাসপাতালের সব জায়গায় শুধু রোগীর চাপ। যদি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি চালু করা হতো, তাহলে রোগীদের ভোগান্তি কমতো।
বর্তমানে পিরোজপুর ১০০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে কর্মরত ১৫ জন চিকিৎসক ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে ভর্তি থাকা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন জানিয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নিজাম উদ্দিন বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি তিন শতাধিকেরও বেশি রোগী ভর্তি আছেন। এ কারণে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে কর্মরত চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ ছাড়া ১০০ শয্যার বিপরীতে তিন শতাধিকেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকায় হাসপাতালে জায়গার সংকট তৈরি হয়েছে। তবে দ্রুতই এ সমস্যা সমাধান হবে। ইতোমধ্যে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচ তলা চালু হয়েছে। সেখানে জরুরি বিভাগ স্থানান্তর করে কার্যক্রম চালু হয়েছে। ভবনটি সম্পূর্ণ চালু করতে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
পিরোজপুরে চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে আইইডিসিআর থেকে ইনভেস্টিগেশন টিম কাজ করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী পিরোজপুরে প্রচুর পরিমাণ সুপারি গাছ রয়েছে। সুপারি গাছ ও নারিকেল গাছের গোড়ায় পানি জমে এবং নারিকেলের খোশায় পানি জমাসহ বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানির মাধ্যমে মশার জন্ম হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতনতার অভাব রয়েছে বলেও জানান তারা। স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত কাজ করছি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করছি। বর্তমানে পিরোজপুর সদর হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে ডেঙ্গু চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অপরদিকে জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ রোধ করতে এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে জানিয়ে পিরোজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পুকুর, ডোবা ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার ড্রেন পরিষ্কারের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নসহ ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়াও জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে মশক নিধন কার্যক্রমের জন্য ফগার মেশিন আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আগামীকাল থেকে ফগার মেশিনের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
পিরোজপুরে এ বছর সর্বাধিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, এর আগে বরিশাল বিভাগের মধ্যে ডেঙ্গুর হটস্পট ছিল বরগুনা। তবে এ বছর আক্রান্ত রোগী কম। কিন্তু এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্তের দিক থেকে পিরোজপুরে সর্বাধিক এবং দ্বিতীয় অবস্থানে ঝালকাঠি। বর্তমানে বৃষ্টির মৌসুম চলছে প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে এ কারণেই ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও আরও সচেতন হতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি ইউনিয়ন পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের মশক নিধন কার্যক্রমকে আরও জোরদার করতে হবে।
বর্তমানে পিরোজপুরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট দূর করতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৪৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকার বেশ কিছু চিকিৎসক নিয়েছে। এর মধ্যে দুই শতাধিকেরও বেশি চিকিৎসক বরিশাল বিভাগে নিয়োগ হয়েছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তাদের পদায়ন করা হয়েছে। সরকারের নানামুখী চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে আমাদের যে চিকিৎসক আছেন, তারা যথাসম্ভব আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করছেন। এর ফলে আক্রান্ত রোগীদের বেশিরভাগই সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। আর এ কারণেই বরিশাল বিভাগে মাত্র ৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর প্রধান ওষুধ হচ্ছে স্যালাইন যা পর্যাপ্ত আছে। এছাড়াও পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিটও রয়েছে। তবে যদি কোথাও কিটের ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে স্থানীয়ভাবে এমএসআরের বরাদ্দের মাধ্যমে তা কিনতে পারবে। ঢাকায় যোগাযোগ করেও সংগ্রহ করতে পারবে।
১০০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে রোগীদের পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে পিরোজপুরের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি চালু করার বিষয়ে তিনি বলেন, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে নির্মিত নতুন ভবনে কিছু কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। বিশেষ করে এখন পর্যন্ত লিফট সংযোজন করা হয়নি। আর লিফট ছাড়া অসুস্থ রোগী নিয়ে বহুতল ভবনে ওঠা সম্ভব হবে না। তবে টেন্ডার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে লিফট সংযোজন সম্পন্ন হবে।