বরগুনা প্রতিনিধি :: বরিশালে নির্মাণের ২ মাসেই ধসে পড়ল দেড় কোটি টাকার বেড়িবাঁধ
দুই মাসের মাথায় ধসে পড়েছে বরগুনায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অর্থায়নে নির্মিত এক কোটি ৪০ লাখ টাকা বেড়িবাঁধ। তদারকির অভাবে অনিয়মের কারণেই বাঁধটি ধসে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে এ জন্য বাস্তবায়ন সহযোগী বেসরকারি সংস্থা জাগো নারীকে দায়ী করছেন স্থানীয় অধিবাসীসহ সংশ্লিষ্টরা।
যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছে জাগো নারী। আর ঠিকাদারদের দাবি, নকশায় ত্রুটির কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস উপজেলা প্রশাসনের।
নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের খাকদোন নদী তীরবর্তী পোটকাখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমনে নির্মাণ করা হয় এই রিং বেড়িবাঁধ। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অর্থায়নে এ কাজে ব্যয় হয় এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। কাজ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা জাগো নারী। যথাযথ তদারকির অভাবে কাজে অনিয়মের কারণে বেড়িবাঁধ ও গাইড ওয়াল ধসে পড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এ ছাড়াও বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ৪০ শতাংশ মাটি দূর থেকে বহন করে আনার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, বাঁধের পাশের খাল খনন করে বেড়িবাঁধে মাটি দেয়া হয়েছে। এতে খুব অল্প সময়েই বাঁধ ও গাইড ওয়াল খালে ধসে পড়েছে। এ ছাড়াও ৬৫০ মিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও পরবর্তীতে নির্মাণ করা হয়েছে ৬২৮ মিটার। এজন্য জাগো নারীকে দুষছেন এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্টরা।
পোটকাখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আল-আমিন বলেন, ‘গাইড ওয়াল পুরোটা যদি ভালোভাবে করত তাহলে ধসে পড়তো না। বেড়িবাঁধ খুব নরমালভাবে করা হয়েছে, তাই পুরোটাই ধসে গেছে। নরম মাটি বেড়িবাঁধে দেয়া হয়েছে। নরম মাটির পরিবর্তে যদি শক্ত মাটি দিতো তাহলে বেড়িবাঁধ টেকসই হতো।’
মো. নান্নু নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘বেড়িবাঁধের কাজে যদি কর্তৃপক্ষ শক্তভাবে চেক দিত তাহলে কাজ ভালো হতো। এ কাজ করিয়েছে জাগো নারী। কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদারকে জাগো নারীর চেক দেয়ার কথা, কিন্তু তা দেয়নি। জাগো নারী চেক দেয়নি বলে বাঁধের কাজ খারাপ হয়েছে, তাই ভেঙে গেছে।’
মো. বাবুল খান নামে অপর আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘বেড়িবাঁধের মাটি খাল থেকে ভেকু দিয়ে তোলা হয়েছে। খালে গর্ত করার কথা ছিল না। দূর থেকে মাটি এনে বেড়িবাঁধে দেয়ার কথা ছিল। খাল থেকে গর্ত করে মাটি উঠানোর কারণে সাপোর্ট না পেয়ে গাইড ওয়াল এবং বেড়িবাঁধ ভেঙে খালে পড়েছে।’
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা নাসিমা বলেন, ‘ভাটায় যখন খাল শুকিয়ে গেছে, তখন খালের মুখে বাঁধ দিয়ে খাল থেকে ভেকু দিয়ে মাটি তুলে বেড়িবাঁধে দেয়া হয়েছে। এভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণের কারণে আমরা যারা বেড়িবাঁধের পাশে বসবাস করছি, তাদের ঘর বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়। পানি যাওয়ার এখন আর কোনো জায়গা নেই। দেড় কোটি টাকার কাজ হয়েছে। কিন্তু পানি নামার কোনো পথ রাখা হয়নি। এখানে ড্রেন নির্মাণ করার দরকার ছিল। ড্রেন করা হলে পানি ড্রেন দিয়ে নেমে যেত।’
ঢলুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মো. মনিরুজ্জামান বাবুল মোল্লা বলেন, ‘বেড়িবাঁধ নির্মাণ নিয়ে জাগো নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণে যে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তা দিয়ে ওইরকম বেড়িবাঁধ তিনটা করা যায়। মূলত সমস্ত টাকা ব্যয় না করে তিন ভাগের দুই ভাগ আত্মসাৎ করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে জাগো নারীর প্রধান নির্বাহী হোসেন-আরা হাসি বলেন, ‘বিশ্বাস খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি) আমাদের মাধ্যমে অর্থ প্রাপ্তির চ্যানেল করে দিয়েছে। কাজটি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে হবে। টাকা সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদে দেয়া হয়েছে। কাজটির জন্য একটি টিম করা ছিল। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এই কমিটির সভাপতি ছিলেন। তার সঙ্গে এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ছিল। কাজ তারা বাস্তবায়ন করেছে। তারা কাজের মান দেখে রিপোর্ট দিয়েছে তারপর ইউনিয়ন পরিষদ টাকা দিয়েছে।’
তবে কাজের মানের প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আমিতো ইঞ্জিনিয়ার না। এটা ইঞ্জিনিয়াররা চেক করবে। এগুলোর সব দায়িত্ব উপজেলা পরিষদ এবং ইঞ্জিনিয়ারদের। তবে কাজের মান অবশ্যই ভালো ছিল।’
কাজে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে এ বিষয়ে ঠিকাদার মোস্তফা জামান মিল্টন বলেন, ‘ডিজাইনে বেড়িবাঁধের শ্লোপ ১:৩ না দিয়ে ১:২ দেয়া হয়েছে। এজন্য বৃষ্টির পানি ফাঁকে ঢুকে কিছু অংশ খালে নেমে গেছে। বর্ষা মৌসুম শেষ হলে ভাঙা অংশ মেরামত করে দেয়া হবে।’
এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘জাগো নারী আমাদের জানিয়েছে, এই কাজটি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাস্তবায়ন হবে। আমি তাদের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছি। কিন্তু কাজের গুণগত মান কিংবা প্লান অনুযায়ী কাজ হয়েছে কিনা এ সম্পর্কে জানি না। সাইনবোর্ডে বাস্তবায়নে আমাদের দফতরের নাম ব্যবহার করা হলেও, এ সম্পর্কে আমি আদৌ জানি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্পটি ভিজিট করার জন্য আমাকে কখনো নেয়া হয়নি। এ সম্পর্কে আমার আদৌ ধারণা ছিল না। আর যেহেতু জাগোনারী কাজটা করেছে, এর দায়ভার তাদের ওপর বর্তায়। এটা তো কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ না যে সরকার এটার দায়ভার নেবে।’
এ বিষয়ে এলজিইডির বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘রিং বেড়িবাঁধের বিষয়টি আমার নলেজে এসেছে। শুধুমাত্র প্রাক্কলন তৈরির সঙ্গে সদর উপজেলা প্রকৌশলী এবং তার দফতরের লোকজন জড়িত। এ ছাড়া কাজ বাস্তবায়নের কোনো পর্যায়েই এলজিইডির কোনো কর্মকর্তা জড়িত ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘কাগজে-কলমে দফতরের নাম যে কেউ লিখতে পারেন। তবে কাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের দফতরের কোনো লোকজন ডাকা হয়নি এবং আমাদের কাছ থেকে কোনো ক্লিয়ারেন্স নেয়া হয়নি। কোনো ধাপেই আমরা জড়িত ছিলাম না।’
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল হান্নান প্রধান বলেন, ‘পোটকাখালীতে আমাদের বেড়িবাঁধের বাইরে কিছু বসতি রয়েছে। সেখানকার মা