নিজস্ব প্রতিবেদক :: সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত বরিশালে তাঁর উত্তরসূরি, দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসছেন। যোগ্য পিতা-মাতার উত্তরসূরির কাছে বরিশালবাসীর প্রত্যাশাও অনেক।
তবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম জিয়ার বহু স্মৃতিবিজড়িত বরিশালে তাঁদের কর্মকালের অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন মুছে যাচ্ছে। সরকারি বা দলীয় পর্যায়েও এসব স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। ১৯৭৯ সালের ২৩ নভেম্বর বরিশাল সার্কিট হাউসের যে কক্ষে জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে প্রশাসনিক বিভাগ প্রতিষ্ঠা, বিমানবন্দর নির্মাণ, বরিশাল ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং ১০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ একাধিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল, তারও যথাযথ সংরক্ষণ হয়নি এখনো। শহীদ জিয়ার উত্তরসূরি বেগম জিয়ার হাত ধরেই বরিশাল বিভাগ প্রতিষ্ঠাসহ বেশিরভাগ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু সেসব অতীত স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে সরকারিভাবে যেমন কোনো উদ্যোগ নেই, তেমনি তাঁর দলের তরফ থেকেও কোনো প্রচেষ্টা অনুপস্থিত।
অথচ বেগম খালেদা জিয়ার তিন দফার শাসনামলেই বরিশাল বিভাগ প্রতিষ্ঠাসহ বিমানবন্দর নির্মাণ ও জাতীয় পতাকাবাহী বিমানের ফ্লাইট চালু ছাড়াও বরিশাল-খুলনা জাতীয় মহাসড়কের গাবখানে বাংলাদেশ-চীন ৫ম মৈত্রী সেতু, বরিশাল-ফরিদপুর-ঢাকা জাতীয় মহাসড়কের শিকারপুর ও দোয়ারিকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিল সেতু, বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু, বরিশাল বেতার কেন্দ্র, বরিশাল জেলা জজ আদালত ভবন, নতুন সার্কিট হাউস ভবন, বিভাগীয় গণগ্রন্থাগার ভবনসহ মহিলা টিটিসির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এছাড়াও বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের দপদপিয়ায় এ অঞ্চলের বৃহত্তম সেতু এবং বরিশাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনের নির্মাণকাজ শুরু এবং শহীদ জিয়াউর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বেগম জিয়া। বেগম জিয়ার সরকারই ২০০২ সালে দেশের ৫ম বরিশাল সিটি করপোরেশন গঠন করে।
এছাড়া বরিশাল শহর রক্ষাবাঁধ প্রকল্প, বরিশালসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের ডিজিটাল টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা প্রবর্তন ও ইন্টারনেট পরিসেবা চালু এবং রাষ্ট্রীয় সেলফোনের আওতায় বরিশালকে সংযোজন তাঁরই অবদান। তিনিই ১৯৯৫ সালে রাজধানীর সঙ্গে বরিশাল ও খুলনার নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অচল প্যাডেল হুইল জাহাজ ‘পিএস মাহসুদ’, ‘পিএস অস্ট্রিচ’ ও ‘পিএস লেপচা’র মেকানিক্যাল গিয়ার সংযোজনসহ পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়ন সম্পন্ন করে যাত্রী পরিবহনে ফিরিয়ে দেন। এছাড়া বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূলীয় স্টিমার সার্ভিস নির্বিঘœ করার লক্ষ্যে দুটি নৌযানের আধুনিকায়ন প্রকল্পও অনুমোদন করেন ২০০৬ সালে। এছাড়া ২০০২ সালে অপর প্যাডেল স্টিমার ‘পিএস টার্ন’-এ নতুন ইঞ্জিন সংযোজনসহ আধুনিকায়ন করা হয়। একই বছর চীনা আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ৪টি উপকূলীয় সি-ট্রাক এবং উপকূলীয় জাহাজ এমভি বার আউলিয়াসহ দুটি রো-রো ফেরিও সংগ্রহ করা হয়। যা দেশের অভ্যন্তরীণ উপকূলীয় এলাকার নিরাপদ যাত্রী পরিবহনসহ রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
দপদপিয়া সেতুর নির্মাণকাজের সূচনাসহ কলাপাড়া, হাজীপুর ও মহিপুর সেতু নির্মাণকাজেরও অনুমোদন প্রদান করেছিলেন তিনি। সারা দেশের সঙ্গে সাগরপাড়ের কুয়াকাটার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠাসহ কুয়াকাটায় প্রথম সরকারি পর্যটন মোটেলের নির্মাণকাজ তাঁর সময়ই শুরু হয়।
তাঁর সময়ই বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উপকূলভাগসহ দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথ এবং নদ-নদীর নিরাপত্তা বিধানের বিষয়ে সরকারি পদক্ষেপ কার্যকর হয়। অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের পল্লী যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে হাজার হাজার কিলোমিটার পল্লী সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের ফলে এ অঞ্চলে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। এমনকি দ্বীপজেলা ভোলার যে গ্যাস নিয়ে এখনো বাস্তব কাজের পরিবর্তে নানা কথা চালাচালি চলছে, তার আবিষ্কারও বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরেই। ১৯৯৫ সালের মধ্যভাগে ভোলার শাহবাজপুরে প্রথম পরীক্ষামূলক গ্যাসকূপ খনন শুরু হয় এবং ওই বছরই ৭ নভেম্বর ১ নম্বর কূপে গ্যাসের সন্ধান নিশ্চিত করেন বাপেক্সের প্রকৌশলীরা। পরদিনই বেগম জিয়া ভোলা গ্যাসফিল্ডে ছুটে আসেন। সেই থেকে ভোলায় একাধিক গ্যাসকূপ খনন করে প্রায় ২ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কৃত হলেও বিগত সরকারগুলো সে গ্যাস বরিশালসহ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তবে অতি সম্প্রতি ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন এবং পরবর্তীতে বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে ভোলার বিশাল মজুত থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে বরিশাল মহানগরীতে বেগম খালেদা জিয়ার একাধিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধনের ফলকগুলো এখনো বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে চারদলীয় জোট ক্ষমতা ছাড়ার দিন লগি-বৈঠার তা-বে মহানগরীসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে বেগম জিয়ার সব স্মৃতিচিহ্ন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও বেগম জিয়ার স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। শহীদ জিয়াউর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিফলকটিও হামলা থেকে রক্ষা পায়নি। নগরীর ডেফুলিয়ায় বেগম খালেদা জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে যে নিমগাছের চারা রোপণ করেছিলেন, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ বিশাল রূপ ধারণ করে অতীত স্মৃতির জানান দিচ্ছে। বরিশালের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বেগম জিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ওই স্থানেই শহীদ জিয়ার নামে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি উঠেছে। প্রায় ১৪ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত বরিশালে আজ পর্যন্ত কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ে শিক্ষার ন্যূনতম কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী বরিশালের নগর ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সাধারণ মানুষের এ দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করলেও বাস্তব উদ্যোগ এখনো অনুপস্থিত।