
দীর্ঘ সময়ের এই লোডশেডিংয়ে ব্যাহত হচ্ছে নগরীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঘুমাতে পারছেন না অনেকে। দিনের বেলায় প্রচণ্ড গরমে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালতের কার্যক্রম এবং স্থানীয় সংবাদপত্র প্রকাশনাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জুলাইয়ের শুরু থেকে বরিশাল নগরীতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। শুরুতে মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেও বর্তমানে তা যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দিনের পাশাপাশি গভীর রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল সিটি এলাকায় প্রায় দেড় লাখ গ্রাহক রয়েছেন। নগরীতে বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ১০০ মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের বিশাল ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বরিশাল ওজোপাডিকো লিমিটেডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, “দেড় লাখ গ্রাহকের বরিশাল সিটিতে বিদ্যুতের চাহিদা ১০০ মেগাওয়াট। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে মাত্র অর্ধেক।”
বিদ্যুৎ বিভাগের এই বক্তব্যে নগরবাসীর ভোগান্তির অন্যতম কারণ স্পষ্ট হলেও, কবে নাগাদ পরিস্থিতির উন্নতি হবে—তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি।
দিনের লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি গভীর রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন পরিবারগুলো। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকরা।
নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, রাতে ঘুমানোর সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। অপেক্ষা করতে করতে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় পার হয়ে যায়। গরমে ঘুমানো সম্ভব হয় না। আবার কখন বিদ্যুৎ আসবে, সেই অপেক্ষায় অনেকেই রাত জেগে থাকেন। বিদ্যুৎ আসার পর কিছুক্ষণ না যেতেই আবার চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনাও করা যাচ্ছে না। কখন বিদ্যুৎ থাকবে আর কখন থাকবে না—এ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা।
লোডশেডিংয়ের কারণে বিপাকে পড়েছেন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। বিশেষ করে রাতে পড়াশোনার সময় দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।
পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই মোবাইলের আলো, চার্জার লাইট কিংবা মোমবাতির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনলাইন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, কম্পিউটারভিত্তিক কাজ ও অন্যান্য শিক্ষামূলক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
অভিভাবকরা বলছেন, গরমের মধ্যে শিশুদের পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। দিনের বেলায় তীব্র গরম এবং রাতে ঘন ঘন লোডশেডিং—দুই দিক থেকেই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে বরিশালের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় আদালতের বিচারিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন অফিসের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎনির্ভর কম্পিউটার, ইন্টারনেট, প্রিন্টার, স্ক্যানারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজের গতি কমে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ ফিরে এলেও সব যন্ত্রপাতি ও সিস্টেম স্বাভাবিকভাবে চালু করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
নগরীর ব্যবসায়ীদেরও পড়তে হচ্ছে বাড়তি ভোগান্তিতে। দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট, ওয়ার্কশপ, কম্পিউটার ও ফটোকপি ব্যবসা, অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ও সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী জেনারেটর কিংবা আইপিএস ব্যবহার করছেন। এতে বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বাড়ছে। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে বরিশালের স্থানীয় সংবাদপত্র প্রকাশনাতেও প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংবাদকর্মীরা। সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে কম্পিউটারে সংবাদ লেখা, সম্পাদনা, পৃষ্ঠা তৈরি, প্রুফ দেখা এবং ছাপাখানার বিভিন্ন কাজে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে এসব কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সংবাদপত্র ছাপা ও বিতরণে সময়সূচি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
নগরবাসীর প্রশ্ন, বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় যেখানে প্রায় দেড় লাখ গ্রাহক এবং বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১০০ মেগাওয়াট, সেখানে চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ দিয়ে কীভাবে স্বাভাবিক নগরজীবন নিশ্চিত করা সম্ভব?
তাদের দাবি, বিদ্যুৎ সংকটের প্রকৃত কারণ জনসম্মুখে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, রোগী, শিক্ষার্থী এবং বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বিবেচনায় রেখে লোডশেডিংয়ের সময়সূচি যথাসম্ভব নিয়মতান্ত্রিক করা প্রয়োজন।
নগরবাসীর আরও দাবি, জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া গভীর রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন না রাখা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিতভাবে জনগণকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা উচিত।
বিদ্যুৎ আধুনিক নগরজীবনের অন্যতম প্রধান অবকাঠামোগত সেবা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু ঘরের ফ্যান-লাইট বন্ধ থাকে না; এর সঙ্গে থেমে যায় শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, অফিস, আদালত, যোগাযোগ ও গণমাধ্যমের নানা কার্যক্রম।
বরিশালের মতো বিভাগীয় শহরে দিনের পর দিন যদি ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকে, তাহলে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি নগর অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
তাই বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি দ্রুত নিরসন, লোডশেডিং কমানো এবং গ্রাহকদের জন্য পূর্বনির্ধারিত ও বাস্তবসম্মত সময়সূচি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে এবং বরিশালবাসী আবারও স্বাভাবিক, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা ফিরে পাবেন।