
বরিশাল নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজের একটি অংশ কৌতূহল, হতাশা, খারাপ সঙ্গ কিংবা নানা সামাজিক ও পারিবারিক কারণে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে বিভিন্ন মহলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। শুরুতে কৌতূহল কিংবা বন্ধুর প্ররোচনায় নেওয়া মাদক একসময় পরিণত হতে পারে ভয়াবহ আসক্তিতে। এরপর ধীরে ধীরে একজন তরুণ তার পরিবার, শিক্ষা, কর্মজীবন এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
মাদকাসক্তির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো মাদক সরবরাহ ও ব্যবসাকে ঘিরে গড়ে ওঠা চক্র। অর্থের লোভে এই চক্রগুলো নতুন নতুন মানুষকে মাদকের বাজারে যুক্ত করার চেষ্টা করে—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। ফলে মাদকবিরোধী লড়াই কেবল একজন মাদকসেবীকে চিকিৎসার আওতায় আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; একই সঙ্গে মাদকের সরবরাহ, বিক্রি ও বিস্তারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মাদক ব্যবসার কারণে একটি এলাকার সামাজিক পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অপরাধী চক্রের বিস্তার, কিশোর-তরুণদের বিপথগামী হওয়া এবং পারিবারিক অশান্তি—সবকিছু মিলিয়ে একটি সুস্থ সমাজব্যবস্থার জন্য মাদক বড় ধরনের হুমকি।
আজকের তরুণরাই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। তাদের হাতেই দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও সামাজিক উন্নয়নের ভবিষ্যৎ। অথচ এই তরুণদের একটি অংশ যদি মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ক্ষতিটা শুধু ব্যক্তির নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ ও রাষ্ট্র।
একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তার স্বাভাবিক জীবনযাপনেও বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে পারেন। পড়াশোনা বা চাকরিতে অমনোযোগ, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তার জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলতে পারে।
একই সঙ্গে মাদকের পেছনে অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। চুরি, ছিনতাই, মারামারি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে মাদকের সম্পর্ক নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণকে শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি একই সঙ্গে সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একজন মানুষ যখন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন, তখন তার সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবারও বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাবা-মায়ের উদ্বেগ, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক চাপ—সব মিলিয়ে একটি পরিবারে নেমে আসতে পারে চরম অস্থিরতা।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, একটি পরিবারের স্বপ্ন ও দীর্ঘদিনের পরিশ্রম মুহূর্তেই প্রশ্নের মুখে পড়ে যেতে পারে। সন্তানকে মানুষ করার যে স্বপ্ন নিয়ে বাবা-মা জীবন কাটান, মাদকের কারণে সেই স্বপ্নও ভেঙে যেতে পারে।
বরিশাল নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে মাদকের বিস্তার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোথায় মাদকের বিস্তার বেশি, কারা এর সঙ্গে জড়িত, কীভাবে তরুণদের মাদকের দিকে টানা হচ্ছে—এসব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তবে মাদকবিরোধী অভিযান যেন কেবল সাময়িক অভিযানে সীমাবদ্ধ না থাকে। নিয়মিত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, মাদক সরবরাহের উৎস শনাক্তকরণ এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
মাদক নির্মূলে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা। সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে অভিভাবকদের তা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং কাউন্সেলিং জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। একটি তরুণ যখন ইতিবাচক কাজে ব্যস্ত থাকে, তখন তাকে অপরাধ ও মাদকের অন্ধকার থেকে দূরে রাখার সুযোগও বাড়ে।
মাদকের বিরুদ্ধে কোনো আপসের সুযোগ নেই। তবে কঠোরতার অর্থ শুধু গ্রেপ্তার নয়; মাদকের পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া, আসক্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নতুন প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
বরিশালসহ সারাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এখনই সময়। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, সাংবাদিক, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।
কারণ মাদকের বিরুদ্ধে আজকের নীরবতা আগামী দিনের ভয়াবহ সংকট ডেকে আনতে পারে। একটি প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে এখনই মাদকের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। মাদককে না বলুন—নিজেকে বাঁচান, পরিবারকে বাঁচান, সমাজকে বাঁচান।
পুলিশই পারে মাদক নির্মূল করতে।
নগরবাসীর অভিযোগ, পুলিশ চাইলে বরিশাল নগরীতে মাদকের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে কিছু মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন নগরবাসী।