নিজস্ব প্রতিবেদক :: মাত্র চার মাস। এর মধ্যেই মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি, নাগরিক অভিযোগে তাৎক্ষণিক সাড়া, খাল-ড্রেন পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সামাজিক অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ, হকার পুনর্বাসনের চেষ্টা এবং নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার কারণে বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। তবে তার প্রশাসনিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে অন্য জায়গায়। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা ৭৯৭ কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্পে গতি ফিরিয়ে আনা, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত এবং অসমাপ্ত নগর উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে। আজ বৃহস্পতিবার ঘোষিত হতে যাওয়া বিসিসির নতুন বাজেটকে ঘিরে। তাই নগরবাসীর প্রত্যাশাও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
২০২৩ সালে একনেক সভায় বরিশাল সিটি করপোরেশনের জন্য ৭৯৭কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এই প্রকল্পের আওতায় নগরীর ১৪২টি সড়কসহ প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার রাস্তা পুননির্মান, প্রায় ১০০ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। প্রথম ধাপে ২৬৭ কোটি টাকা ছাড়ের পর ১৮টি প্যাকেজে প্রায় ৪০টি সড়ক ও ড্রেনের কাজ শুরু হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অধিকাংশ কাজ কার্যত থেমে যায়। ঠিকাদারদের অনুপস্থিতি, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধিদের সরে যাওয়ার কারণে প্রকল্পটি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে কিছু কাজ শুরু হলেও সামগ্রিক অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় ছিলো অনেক কম।
এই পরিস্থিতিতেই ১৬ মার্চ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রথম নারী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি নিয়মিত মাঠে নেমে নাগরিক সমস্যার সরেজমিন তদারকি শুরু করেন। নগরীর সাতটি খাল পরিষ্কারের উদ্যোগ, ড্রেন সংস্কার, রাতের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, জলাবদ্ধতা নিরসনে অভিযান, ফুটপাত দখলমুক্ত করার পদক্ষেপ, হকার পুনর্বাসনের উদ্যোগ এবং নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের পরিকল্পনা তাকে দ্রুতই আলোচনায় নিয়ে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে নাগরিক অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ২০ নম্বর ওয়ার্ডের বৈদ্যপাড়া এলাকার জলাবদ্ধ ড্রেন পরিদর্শন ও পরিষ্কারের নির্দেশ, ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন সড়ক পরিদর্শন, রাতের বেলা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম তদারকি এবং উন্নয়নকাজের অগ্রগতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ প্রশাসনের কর্মতৎপরতার নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়াও যুব সমাজের বিনোদনের জন্য এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ বড় পর্দায় দেখানো এবং গভীর রাতে বেল্স পার্কে সিটি প্রশাসকের স্ব-শরীরে উপস্থিতি জনপ্রিয়তা একধাপ এগিয়েছে।
প্রশাসক বিলকিছ আক্তার জাহান শিরীনের মানবিক দিকটিও সমানভাবে আলোচনায় এসেছে। সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় যুক্ত করার অংশ হিসেবে তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক মাইদুল ইসলাম অভিকে বরিশাল সিটি করপোরেশনে চাকরি দিয়ে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রশাসক। এই নিয়োগপত্র প্রদান অনুষ্ঠানে বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী আমাদের সমাজেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা এবং আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব।”
এই উদ্যোগকে সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন সচেতন নাগরিকরা।
পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনাতেও নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বিসিসি। সোনামিয়ার পুল সংলগ্ন ডেফুলিয়া এলাকায় প্রস্তাবিত ইকোপার্কের স্থান পরিদর্শন করে প্রশাসক পরিবেশবান্ধব নগর গঠনের পরিকল্পনার কথা জানান। পাশাপাশি নতুন বাজারে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসবে অংশ নিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তাও দিয়েছেন তিনি।
তবে অর্জনের পাশাপাশি কিছুক্ষেত্রে বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথাও বলছে। হকার পুনর্বাসনের জন্য নগর ভবনের পেছনে ৮৪টি এবং কেডিসি এলাকায় ৫৬টি আধুনিক দোকান নির্মাণ করা হলেও এখনপর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তবে বিসিসি সূত্র জানিয়েছে প্রকৃত হকারদের সংখ্যা দোকানের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় তাদের হিমসিম খেতে হচ্ছে। ডিসি ঘাট থেকে চাঁদমারী খেয়াঘাট এবং ত্রিশ গোডাউন থেকে বরিশাল সেতু পর্যন্ত নদীতীরবর্তী ওয়াকওয়ে, বেরিবাঁধ ও সাইকেলিং ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পও এখনও অনিশ্চিত। অপরিকল্পিতভাবে ঝুলে থাকা ইন্টারনেট ও ডিশ সংযোগের ক্যাবল, খাল দখল, ফুটপাত দখল, যানজট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। অন্যদিকে রাজনৈতিক দায়িত্বে তার রয়েছে সমান সচেতনতা। দলীয় প্রতিটি নেতাকর্মীর সুখ দুঃখের সাথী হয়ে পাশে দাঁড়ানো নিজের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন শিরিন। যে কারণে দলীয় নেতাকর্মীদের অসুস্থতা, পারিবারিক উৎসব বা শোকে তার উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়।
রাজনৈতিক জীবনেও বিলকিস আক্তার জাহান পথচলা বরিশালে। ১৯৮৪ সালে বিএম কলেজে ছাত্রদলের রাজনীতির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে ছাত্র সংসদ, মহিলা দল, জেলা ও মহানগর বিএনপি, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। রাজনৈতিক উত্থান-পতনের নানা অধ্যায় অতিক্রম করে ২০২৬ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, মাঠপর্যায়ে প্রশাসকের সক্রিয়তা ইতিবাচক হলেও এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে স্থবির ৭৯৭ কোটি টাকার প্রকল্পকে পূর্ণ গতিতে ফিরিয়ে আনা। কারণ, ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নগরীর সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলাবদ্ধতার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যার টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হবে।
তাই আজকের বাজেটকে কেবল বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে নয়, বরং বরিশালের উন্নয়নের ভবিষ্যৎ রূপরেখা হিসেবেই দেখছেন নগরবাসী। চার মাসে প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন নাগরিক সেবায় যে কর্মতৎপরতার পরিচয় দিয়েছেন, এখন সেই উদ্যোগ কতটা স্থায়ী উন্নয়ন, দৃশ্যমান অবকাঠামোগত পরিবর্তন এবং স্থবির মেগা প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে রূপ নেয়, সেটিই হবে তার প্রশাসনিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় মূল্যায়ন।
এই নিউজটা থেকে দশটা হেডলাইন করে দাও