তন্ময় তপু :: বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাশ নিয়ে বৃহৎ অঙ্কের ব্যবসার অভিযোগ উঠেছে। ২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতি লাশের বিপরীতে নিয়ে থাকেন মর্গে লাশ আনা-নেওয়ার দায়িত্বে থাকা অবৈতনিক দুই ব্যক্তি। লাশ হস্তান্তরে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে বহুদিন ধরে তাদের বিরুদ্ধে। বিষয়টি ওপেন সিক্রেট থাকলেও নেওয়া হয় না কোনো ব্যবস্থাই। অভিযোগ রয়েছে, টাকার ভাগ পান হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।
হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুরে বরিশালের মুলাদী উপজেলা থেকে মৃত অবস্থাতেই এক শিশুকে নিয়ে আসেন স্বজনরা বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শিশুটিকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করলে লাশ মর্গে পাঠানো হয়। তবে সেই দুপুরের পর থেকেই লাশঘরের দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবক দাবিদার ষাটোর্ধ্ব মোখলেস মিয়া শিশুটির লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তরে নানা টালবাহানা শুরু করেন।
শিশুটির দাদি ফজিলা বেগম বলেন, “দুপুর ২টার দিকেই আমরা লাশ নিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু লাশঘরে লাশ ঢোকানোর পর ওই ব্যক্তি ঘরে তালা দিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। ঘণ্টাখানেক পর এসে সে আমাদের কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করে। আমরা বলি, আমাদের বাড়ি যাওয়ার টাকা ছাড়া আর কোনো টাকা-পয়সা নেই। এই কথা শুনে মোখলেস আবার চলে যান, আসেন সন্ধ্যারও পরে। রাত ১১টা পর্যন্ত নানা টালবাহানা করতে থাকেন তিনি।”
ঘটনাস্থলে উপস্থিত রোগীর স্বজন সালমা ইসলাম অভিযোগ করেন, দুপুরের লাশ রাত পর্যন্ত আটকে রাখার পর সবশেষে শিশুর স্বজনদের কাছে ১ হাজার ৬০০ টাকা দাবি করেন আলমগীর হোসেন। এরপর লাশঘরের সামনে থাকা অন্য রোগীর স্বজনরা প্রতিবাদ করলে তোপের মুখে পড়েন মোখলেস। লাশ নিয়ে ব্যবসা করায় তাকে গণধোলাই দেওয়া হলে আনসার সদস্যরা এসে তাকে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ এসে তাকে নিয়ে যায়।
হাসপাতালে এক সপ্তাহ ধরে চিকিৎসা নেওয়া এক শিশুর বাবা ব্যাংক কর্মকর্তা ফাহিম আব্দুল্লাহ মন্তব্য করেন, “আমি যে ক’দিন রয়েছি, তাতে প্রত্যেক দিনই কমপক্ষে দুইবার এই লাশের দেনদরবার নিয়ে ঝামেলা দেখেছি। বয়স্ক দুই ব্যক্তি টাকা না পেলে লাশ ছাড়েন না। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে লাশ নিয়ে ব্যবসা। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এত বছর ধরে অর্থ আদায়ের বিষয়টি কি হাসপাতাল পরিচালক জানেন না? দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্রে এই অনিয়ম তো ওপেন সিক্রেট।”
গত ২ জুন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক যুবকের লাশ নিয়েও এমন ঘটনা ঘটে। জোর করে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৪ হাজার টাকা। ওই যুবকের বড় ভাই জাহাঙ্গীর মৃধা বলেন, “বয়স্ক এক ব্যক্তি আমাদের কাছে ১০ হাজার টাকা চেয়েছিল লাশঘরের রক্ত পরিষ্কার করার জন্য। পরে দেড় ঘণ্টার মতো এ নিয়ে ঝামেলার পর ৪ হাজার টাকায় সে রাজি হয়। ওই ব্যক্তি জানিয়েছিল, তার কোনো বেতন নেই, আমাদের দেওয়া টাকাতেই সে জীবিকা নির্বাহ করে। বেতন ছাড়াই তো এই ব্যক্তির মাসে কয়েক লাখ টাকা আয় রয়েছে। আমাদের ধারণা, এই লাশের টাকা সিন্ডিকেট করে আত্মসাৎ করা হয়।”
হাসপাতালের এক ওয়ার্ড বয় জানিয়েছেন, মোখলেস মিয়া ও আলমগীর হাওলাদার হাসপাতালের কোনো কর্মচারী নন। কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে তারা হাসপাতালে এই কাজ করে থাকেন। তারাই লাশঘর থেকে মর্গে লাশ আনা-নেওয়ার কাজ করেন। আর স্বজনদের কাছ থেকে টাকা চাওয়া নিয়ে তাদের সঙ্গে ঝামেলা নতুন নয়, এটি নিত্যদিনের ঘটনা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে নিজেকে হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবক দাবি করা মোখলেস মিয়া বলেন, “আমি কোনো বেতন পাই না। স্বজনদের কাছ থেকে টাকা না পেলে আমার পেট কীভাবে চলবে? আমি তো লাশঘর পরিষ্কার করা এবং লাশঘর থেকে মর্গে লাশ নিয়ে যাওয়ার কাজ করি। আমি টাকা না নিলে চলব কীভাবে?”
এদিকে মঙ্গলবার রাতে গণধোলাইয়ের শিকার হওয়ার পর মোখলেস স্বজনদের কাছ থেকে লাশ ছাড়ার জন্য টাকা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এসব মিথ্যা অভিযোগ।”
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবদুল মুনয়েম সাদ বলেন, “হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এর সঙ্গে জড়িত থাকায় বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা হাসপাতালের স্টাফ নন, বহিরাগত। দীর্ঘ বছর ধরে লাশ-সংক্রান্ত আনা-নেওয়ার কাজ তারা করছেন। মোখলেস নামের ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালে না আসার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
বৃহত্তর বরিশাল বিভাগের সকল গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পড়তে বরিশালের নির্ভরযোগ্য অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম “বরিশাল পোস্ট” এর সাথেই থাকুন। সবার আগে সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা নয়; বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রকাশই আমাদের মূল লক্ষ্য কারন ‘আমরা বরিশালের কথা বলি’…