
নিজস্ব প্রতিবেদক :: ১১তম প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান।
অবশেষে ফুরোচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা, আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার পর ছেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বসতে যাচ্ছেন দেশের সর্বোচ্চ পদে।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আজ মঙ্গলবার বিকেলে নিশ্চিতভাবেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন তিনি। এর মাধ্যমে তারেক রহমান হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দীন আহমদ। এর পর একে একে শেখ মুজিবুর রহমান, মুহাম্মদ মনসুর আলী, শাহ আজিজুর রহমান, আতাউর রহমান খান, মিজানুর রহমান চৌধুরী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, কাজী জাফর আহমেদ, বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা। এর মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া দু’বার এবং শেখ হাসিনা ৫ বার (তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন) প্রধানমন্ত্রী হন।
অথচ এই তারেক রহমানকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক মামলায় গ্রেফতার, অবর্ণনীয় নির্যাতন চালায় ১/১১’র সরকার। নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয় দেশের মাটি ও মানুষের কাছ থেকে। ১/১১’র আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের ষড়যন্ত্রের কারণে দীর্ঘ ১৭ বছর সুদূর লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২৪’র ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আওয়ামী সরকার পতনের পর গতবছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন তিনি। দেশে ফিরে ৫ দিনের মাথায় হারান মা বেগম খালেদা জিয়াকে। সেই শোক মাথায় নিয়েই নামতে হয়েছে ভোট যুদ্ধে। প্রথমবারের মতো দুটি আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই নির্বাচিত হয়েছেন। তার দল বিএনপিও পেয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ফলে নিশ্চিতভাবেই তিনি হতে যাচ্ছেন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী।
বগুড়ায় বিপুল ভোটে বিজয়ী : বগুড়া পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ড ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিপুল ভোটের ব্যবধানে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। ১৫০টি কেন্দ্রের সব কটিতে বিজয়ী হয়ে তারেক রহমান পেয়েছেন ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জামায়াতের বগুড়া শহর শাখার আমির আবিদুর রহমান পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৬২৬ ভোট। এখানে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৩ জন। ভোট পড়েছে ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বেসরকারি এ ফলাফল ঘোষণা করেন। একইভাবে ঢাকা-১৭ আসনেও বিজয়ী হয়েছেন তারেক রহমান। যদিও গতকাল ঢাকা-১৭ আসনটি রেখে বগুড়া-৬ আসনটি ছেড়ে দিয়েছেন তারেক রহমান। এর ফলে ওই আসনটি ইতোমধ্যে শূণ্য ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। পরবর্তীতে এই আসনে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
জানা যায়, বেগম খালেদা জিয়া তার জীবদ্দশায় যত আসনেই নির্বাচন করেছেন তার সবকটিতেই তিনি বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর জীবনে তিনি কোন নির্বাচনে পরাজিত হননি। তার ছেলে তারেক রহমানও জীবনের প্রথম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সেই পথেই নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা করলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক প্রবণতা ও বেসরকারি ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে বিএনপি ও তাদের সমর্থিত জোট ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করেছে। এই ফলের মধ্য দিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান নিশ্চিতভাবেই প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, যা এখন কেবলমাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম এই প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে জনমতের একচ্ছত্র প্রতিফলন ঘটেছে ধানের শীষের পক্ষে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে রাজধানী জুড়ে যে কোটি মানুষের ভালোবাসা ও সংবর্ধনায় সিক্ত হয়েছিলেন তারেক রহমান। তা ধরে রেখেছেন নির্বাচনী প্রতিটি জনসভায়ও। দেশে ফিরে যেখানেই গেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান লাখ লাখ মানুষ ছুটে এসেছেন তাকে দেখতে, তার কথা শুনতে। ফলে বেগম খালেদা জিয়াকে হারিয়ে এবারই প্রথম দল ও নির্বাচনে নেতৃত্ব দিয়ে নিজের ক্যারিশমায় বিহীন নির্বাচনে দলকে শুধু বিজয়ীই করলেন না, বরং ভূমিধ্বস বিজয়ের মাধ্যমে তার নেতৃত্বেই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।
রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী নেতৃত্বের উদাহরণ সৃষ্টি : দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে যেভাবে দেখে অভ্যস্ত। সেই চিরচেনা ধারা এবার ভেঙে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তারেক রহমান। দেশে যেদিন ফিরেছেন সেদিন থেকেই বুলেটপ্রুফ গাড়ির পরিবর্তে চলেছেন বাসে করে, সভা-সমাবেশের স্টেজে উঠার আগে সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মেলানো, বক্তব্যের সময় ডায়েসের সামনে ভাষণের পরিবর্তে স্টেজের চারপাশে হেটে হেটে বক্তব্য দেয়া, পথে যেখানেই তার জন্য মানুষকে অপেক্ষা করতে দেখেছেন সেখানেই তিনি দাঁড়িয়ে গেছেন, তাদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়েছেন, কোথাওবা বাসের দরজা খুলে কথা বলেছেন। আবার সমাবেশের মঞ্চে হঠাৎ করেই শ্রোতা সারি থেকে কাউকে কাউকে ডেকে এনে শুনেছেন তাদের চাওয়া, কথা বলেছেন তাদের সাথে। তার এই ধরণের ব্যতিক্রমী কর্মকা- তার জনপ্রিয়তা যেমনি বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি রাজনীতিতে নেতৃত্বকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছে দেশের মানুষ।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজনীতির চিরাচরিত বিদ্বেষমূলক পরিবেশ দূরে ঠেলে ছুটে গেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী তিন রাজনৈতিক দলের প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাত করতে। গত রোববার তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। আর গতকাল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর আমির (চরমোনাই পীর) মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। যা রাজনৈতিক অঙ্গনে তারেক রহমানের ইমেজকে বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাস্তবভিত্তিক প্ল্যান: ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেই গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রথম ভাষণে তারেক রহমান বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। তার সেই ঘোষণার পর থেকেই মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন তিনি কি প্ল্যান নিয়ে এসেছেন। পরবর্তীতে নানা সময়ে বক্তব্য, আলোচনা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে নিজের প্ল্যান তুলে ধরেছেন। নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, বেকার সমস্যা, কর্মসংস্থানসহ সবক্ষেত্রেই তিনি যে প্ল্যান তুলে ধরেছেন তা ঘোষণার পর থেকেই আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে নির্বাচনেও সেটি ব্যাপক প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁর ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব এবং পরিবার কার্ডের মতো যুগান্তকারী প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের মন জয় করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান নিজেকে কেবল জিয়ার সন্তান হিসেবে নয়, বরং একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষ করে দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি তাঁকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।


