
বরগুনার বেতাগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হককে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচালিত কিছু প্রচারণা নিয়ে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে পাথরঘাটা ডটকম নামের একটি অনলাইন পেজ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর পক্ষের একাধিক ব্যক্তি। তাঁদের দাবি, পাথরঘাটা থানায় দায়িত্ব পালনকালে অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও মাদকবিরোধী অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পরও একটি পক্ষ তাঁকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট প্রকাশনার বক্তব্য এবং অভিযোগগুলোর পেছনের প্রকৃত কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট পেজের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওসি এনামুল হক পাথরঘাটা থানায় কর্মরত থাকাকালে বিভিন্ন অপরাধ দমন এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের দাবি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তাঁর তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
তাঁর পক্ষের ব্যক্তিরা বলছেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর কাজ, তদন্তের ফলাফল, আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা এবং জনসেবার ভিত্তিতে। কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে একজন কর্মকর্তার পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হয়ে থাকলে তা অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে তাঁর দায়িত্বকালীন সাফল্যের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযান, মামলা, উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান এবং সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি যাচাই করা গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পাথরঘাটা ডটকম নামের পেজটিকে ঘিরে পাথরঘাটা থানায় দুটি এবং ঢাকায় একটি সাইবার অপরাধসংক্রান্ত মামলা হয়েছে বলে তাঁরা দাবি করছেন। তাঁদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট পেজের পক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ না করা এবং এ-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ওসি এনামুল হকের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
তবে এসব মামলার নম্বর, দায়েরের তারিখ, বাদীর পরিচয়, মামলার বর্তমান অবস্থা এবং অভিযোগের সঙ্গে ওসি এনামুল হকের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন। মামলার অস্তিত্ব থাকলেও কেবল মামলা দায়েরের তথ্য দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা পেজকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হচ্ছে—প্রকাশিত কোনো তথ্যের পেছনে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না, নাকি ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে একপক্ষের বিরুদ্ধে একতরফা বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে? এর উত্তর পেতে প্রয়োজন তথ্য-প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, পাথরঘাটা ডটকম নামের পেজটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের আদলে পরিচালিত হলেও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো নিবন্ধিত সংবাদপোর্টাল রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজের সঙ্গে ওয়েবসাইট না থাকা বা নিবন্ধনের তথ্য সহজে খুঁজে না পাওয়া মাত্রই সেটিকে ভুয়া সংবাদমাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয়, ওয়েবসাইট, প্রযোজ্য নিবন্ধন বা অনুমোদনের তথ্য এবং প্রকাশনার নীতিমালা যাচাই করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।
একই সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংবাদ প্রকাশের নামে কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর কিংবা প্রমাণহীন অভিযোগ প্রচার করা হয়ে থাকলে তার দায়ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পেজটিকে ব্যবহার করে মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করা এবং বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন ব্যক্তি। তাঁদের দাবি, অনলাইন প্রকাশনার পরিচয় ব্যবহার করে কাউকে চাপের মুখে ফেলা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা হয়ে থাকলে তা বন্ধ হওয়া উচিত।
তবে ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য, বার্তা বা যোগাযোগের রেকর্ড, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং আইনগত নথি গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরও নিজের বক্তব্য তুলে ধরা এবং আইনি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার রয়েছে।
ওসি এনামুল হকের পক্ষের একাধিক ব্যক্তির দাবি, তিনি একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁদের মতে, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা উচিত। একই সঙ্গে যাচাইহীন তথ্যের ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়ে থাকলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তাঁরা আরও বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার কাজের সমালোচনা করার অধিকার গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের রয়েছে। কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, যুক্তিসংগত এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। ব্যক্তিগত আক্রমণ, অসমর্থিত অভিযোগ কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে কারও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অন্যদিকে, ওসি এনামুল হকের দায়িত্বকালীন কার্যক্রম, তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং পাথরঘাটা ডটকমের প্রকাশিত বক্তব্য—সবকিছুই প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিও অপরিহার্য। কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণসহ প্রকাশ করা যেতে পারে। একইভাবে কোনো সংবাদমাধ্যম বা অনলাইন পেজের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, হয়রানি কিংবা ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ উঠলেও তা যথাযথ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সামনে আনা প্রয়োজন।
কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে আগেভাগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বলে তা উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয় নয়।
এ কারণে পাথরঘাটা ডটকমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ, ওসি এনামুল হকের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট সাইবার অপরাধের মামলার নথি এবং দায়িত্ব পালনকালে তাঁর কর্মকাণ্ড—সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে ওসি এনামুল হকের বক্তব্য, পাথরঘাটা ডটকমের পরিচালকদের প্রতিক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট মামলার নথি এবং দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পেজের বক্তব্য পাওয়া গেলে সেটিও যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা উচিত।
স্থানীয়দের নামে যাঁরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তাঁদের পরিচয় ও বক্তব্যও নির্দিষ্টভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এতে প্রতিবাদের পরিধি, জনমতের প্রকৃত চিত্র এবং অভিযোগের ভিত্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
কোনো পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা সংবাদমাধ্যম—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হলো নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, যাচাইযোগ্য প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য। ওসি এনামুল হককে ঘিরে ওঠা অভিযোগেরও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসুক—এটাই প্রত্যাশা।