
দক্ষিণাঞ্চলের শিশুদের উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে বরিশাল নগরের আমানতগঞ্জে নির্মাণ করা হয়েছে ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল। কিন্তু নির্মাণকাজ শুরুর প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত বিশাল ভবনটি থাকলেও এর সুফল পাচ্ছে না বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের অসংখ্য শিশু ও তাদের পরিবার।
২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০১৯ সালের মধ্যেই হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা চালুর কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও একের পর এক জটিলতায় আটকে থাকে কার্যক্রম। সময় গড়িয়েছে, প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে, নির্মাণকাজ এগিয়েছে—কিন্তু হাসপাতালের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
এখন তাই প্রশ্ন উঠছে—ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও হাসপাতাল চালু করতে এত সময় লাগছে কেন? আর কবে থেকে সত্যিকার অর্থে চিকিৎসাসেবা পাবেন দক্ষিণাঞ্চলের শিশুরা?
হাসপাতাল নির্মাণের শুরুতে প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কাজ যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘ সময় ধরে নির্মাণকাজ ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি চললেও হাসপাতাল চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা একই গতিতে এগোয়নি।
২০২৬ সালেও হাসপাতালের বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নিয়ে নানা জটিলতার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ভবন বা অবকাঠামো নিয়ে নয়। একটি ২০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল চালাতে হলে কতজন চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন, কোন কোন বিভাগ থাকবে, কী ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম লাগবে, কতগুলো শয্যা কোন বিভাগে থাকবে—এসবের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো ও সরকারি অনুমোদন।
এই কাঠামো অনুমোদিত না হলে প্রয়োজনীয় স্থায়ী জনবল নিয়োগও সম্ভব নয়। ফলে ভবন থাকলেও কার্যকর হাসপাতাল গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য তখনও পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো তৈরি না হওয়ার তথ্য উঠে আসে। অথচ পরবর্তী সময়ে আগস্টে হাসপাতাল চালুর প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে।
এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন—হাসপাতাল চালুর প্রস্তুতি যদি এখনো চলমান থাকে, তাহলে ভবন নির্মাণের সময় থেকেই জনবল কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া হলো না কেন?
একটি হাসপাতাল চালু করার ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণ এবং জনবল কাঠামো প্রণয়নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নিরাপত্তাকর্মীসহ প্রয়োজনীয় জনবল ছাড়া কোনো হাসপাতাল কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুদের চিকিৎসার জন্য শিশু বিশেষজ্ঞ, নবজাতক ও জটিল শিশু রোগের চিকিৎসক, অ্যানেসথেশিয়া, নার্সিং, জরুরি বিভাগ, আইসিইউ এবং প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক সুবিধাসহ একটি সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
হাসপাতালটি পরিচালনা করবে কোন কর্তৃপক্ষ—এ নিয়েও দীর্ঘদিন সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত ছিল না।
প্রথমদিকে হাসপাতালটিকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। কিন্তু নতুন শিশু হাসপাতালটি শেবাচিম হাসপাতাল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে হওয়ায় একই প্রশাসনিক কাঠামো ও জনবল দিয়ে দুটি পৃথক স্থানে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা কতটা সম্ভব—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালকের পক্ষ থেকেও একই জনবল দিয়ে দুই স্থানে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন বলে মত দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
পরবর্তীতে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নির্দেশনায় বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগকে হাসপাতাল চালুর জন্য ভবন গ্রহণ, প্রশাসনিক অনুমোদন, পদ সৃজন, আসবাব ও যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ প্রয়োজনীয় কাজ সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলার সিভিল সার্জন হাসপাতালটির সার্বিক বিষয় দেখভাল করবেন।
অর্থাৎ প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠার পথে। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়—এই সিদ্ধান্তগুলো নির্মাণকাজের সঙ্গে সমান্তরালে নেওয়া হয়নি কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পকে শুধু ভবন নির্মাণ হিসেবে দেখলে চলবে না। হাসপাতালের ভবন তৈরি হওয়ার আগেই এর সাংগঠনিক কাঠামো, প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জামের তালিকা, ক্রয় পরিকল্পনা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সেবা চালুর রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।
কিন্তু বরিশালের শিশু হাসপাতালের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভবন নির্মাণের দীর্ঘ সময় পরও এসব বিষয়ে নানা ধাপ সম্পন্ন করতে হচ্ছে।
ফলে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও হাসপাতাল চালু করতে নতুন করে সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
এতে শুধু সরকারি অর্থ ও সময়ের অপচয় হচ্ছে না; সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে সাধারণ মানুষ।
বরিশালের সরকারি হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে বিভিন্ন মৌসুমে শিশুদের নানা রোগের প্রকোপ বাড়লে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
চলতি বছর হামের প্রাদুর্ভাবের সময়ও বরিশালের সরকারি হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে যদি নগরীতে ২০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু থাকত, তাহলে শিশু রোগীদের জন্য আলাদা ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি হতো। একই সঙ্গে শেবাচিম হাসপাতালের শিশু বিভাগেও রোগীর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতো।
কিন্তু বছরের পর বছর ধরে হাসপাতালটি কার্যকরভাবে চালু না হওয়ায় সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ।
সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে বরিশাল, খুলনা, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় পাঁচটি ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের জন্য আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো।
কিন্তু বরিশালের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, শুধু হাসপাতালের ভবন নির্মাণ করলেই প্রকল্পের সফলতা নিশ্চিত হয় না। ভবনের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, সহায়ক কর্মী, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা, জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি হাসপাতাল উদ্বোধন করা আর হাসপাতাল চালু করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
বরিশালের মানুষ এখন আর শুধু হাসপাতাল চালুর ঘোষণা শুনতে চায় না। তারা চায় বাস্তবে চিকিৎসাসেবা।
হাসপাতাল চালুর ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—দ্রুত সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন, প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি, জনবল নিয়োগ, চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্পন্ন করা।
এর পাশাপাশি হাসপাতালটির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি বা রোডম্যাপ জনগণের সামনে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
কোন মাসে প্রশাসনিক কাঠামো চূড়ান্ত হবে, কখন পদ সৃষ্টি হবে, কখন জনবল নিয়োগ হবে, কখন যন্ত্রপাতি আসবে এবং কোন তারিখ থেকে বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগের চিকিৎসাসেবা শুরু হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকলে দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
বরিশালে নির্মাণাধীন ৪৬০ শয্যার ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগ হাসপাতাল নিয়েও এখন থেকেই একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন।
হাসপাতালটির নির্মাণকাজ ২০২৬ সালের জুনে শেষ পর্যায়ে থাকার কথা জানানো হয়েছিল। প্রকল্পটির মেয়াদও জুন ২০২৮ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
তাই শিশু হাসপাতালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বড় এই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ভবন নির্মাণের অপেক্ষায় না থেকে এখনই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো, সাংগঠনিক অনুমোদন, জনবল পরিকল্পনা, চিকিৎসা সরঞ্জামের তালিকা ও ক্রয় পরিকল্পনা এবং পরিচালন কাঠামো প্রস্তুত করা জরুরি।
নইলে ভবিষ্যতে একই চিত্র দেখা দিতে পারে—ভবন থাকবে, কিন্তু হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
বরিশালের ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল নিয়ে এখন সাধারণ মানুষের কয়েকটি স্বাভাবিক প্রশ্ন রয়েছে—
হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো কবে অনুমোদিত হবে?
কবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে?
কবে হাসপাতালের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা ও স্থাপন শেষ হবে?
কবে হাসপাতালটি পরীক্ষামূলকভাবে চিকিৎসাসেবা শুরু করবে?
আর কবে থেকে দক্ষিণাঞ্চলের শিশুরা পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত চিকিৎসা পাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের দাবি।
সরকারি অর্থে নির্মিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
হাসপাতাল নির্মাণের উদ্দেশ্য শুধু একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন তৈরি করা নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করা, রোগীর দুর্ভোগ কমানো এবং উন্নত চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।
বরিশালের শিশু হাসপাতাল সেই লক্ষ্য পূরণে এখনো পুরোপুরি সফল হতে পারেনি।
তাই এখন আর নতুন করে শুধু উদ্বোধনের তারিখ ঘোষণা নয়—প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক উদ্যোগ।
সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন, প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি, দক্ষ জনবল নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ, বিদ্যুৎ-পানি ও অন্যান্য অবকাঠামো নিশ্চিত করে ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার শিশু ও তাদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বরিশালের এই হাসপাতালটি সত্যিকার অর্থে একটি কার্যকর, আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত শিশু চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হোক—এটাই এখন বরিশালবাসীর প্রত্যাশা।
কারণ, একটি হাসপাতালের সাফল্য তার ভবনের আকারে নয়—কত দ্রুত, কতজন এবং কতটা মানসম্মত চিকিৎসাসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করে।