নিজস্ব প্রতিবেদক :: মোবাইল ব্যবহারেই দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, ঝুঁকিতে ২৫-৩০% শিশু
একসময় বিকেল মানেই ছিল মাঠজুড়ে ছুটে বেড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর প্রাণচঞ্চল শৈশব। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন অনেক শিশুর বিকেল কাটে স্মার্টফোনের ছোট্ট পর্দায় চোখ আটকে রেখে। ইউটিউব, অনলাইন গেম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে থাকা এই প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে বাড়ছে চোখের নানা জটিলতা। চিকিৎসকদের ভাষ্য, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার ইতোমধ্যেই দক্ষিণাঞ্চলের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ শিশু ও কিশোরের দৃষ্টিশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে মায়োপিয়া বা স্বল্পদৃষ্টি। এই সমস্যায় আক্রান্ত হলে কাছের জিনিস স্পষ্ট দেখা গেলেও দূরের বস্তু ঝাপসা লাগে। একসময় যে সমস্যা মূলত কিশোর বা তরুণদের মধ্যে দেখা যেত, এখন তা অল্প বয়সী শিশুদের মধ্যেও উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসাধীন অনেক শিশুর সময় কাটছে মোবাইল ফোনে। শিশু ওয়ার্ডের একাধিক বেডে দেখা গেছে, কেউ ভিডিও দেখছে, কেউ গেম খেলছে, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত। শুধু রোগী নয়, স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালে আসা অনেক শিশুও মোবাইল ফোনে ডুবে আছে।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা শিশুদের চোখের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ঘরবন্দি জীবন, খেলাধুলার অভাব এবং প্রাকৃতিক আলো থেকে দূরে থাকা। ফলে দিন দিন বেড়ে চলেছে মায়োপিয়ার ঝুঁকি।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশির দাস জানায়, স্কুল শেষে তার বেশিরভাগ সময় কাটে বাসায়। বিকেলে কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার কারণে মাঠে যাওয়ার সুযোগ খুব একটা হয় না। তাই অবসর সময়ে ইউটিউব দেখা ও মোবাইল গেম খেলা তার নিয়মিত অভ্যাস। সম্প্রতি দূরের জিনিস দেখতে সমস্যা হওয়ায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়েছে তাকে।
অভিভাবকদের অনেকেই স্বীকার করছেন, সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ রাখতে তারা ব্যর্থ হচ্ছেন। কেউ কেউ জানান, মোবাইল ছাড়া তাদের সন্তান খেতেই চায় না। শিশুকে খাওয়ানো বা ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে অনেক পরিবারই অজান্তে মোবাইল ফোনকে বেছে নিচ্ছে। অথচ এই অভ্যাসই ধীরে ধীরে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
একাধিক অভিভাবক বলেন, শহরে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। যেসব মাঠ আছে, সেগুলোও অনেকের বাসা থেকে দূরে। নিরাপত্তা ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিদিন সন্তানকে বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শিশুদের অবসর সময়ের প্রধান সঙ্গী হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু রোগীদের ওপর সম্প্রতি পরিচালিত এক পরিসংখ্যানভিত্তিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। এতে দেখা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ শিশু-কিশোর মোবাইল আসক্তিজনিত কারণে দৃষ্টিশক্তি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের চিকিৎসক ডা. এম আর খান সোহান বলেন, প্রতিদিন হাসপাতালে আসা শিশু রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের চোখের সমস্যার পেছনে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রভাব রয়েছে। অনেক শিশুই দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে চোখের চাপ, ঝাপসা দেখা এবং মায়োপিয়ার সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, বিশেষ করে শহরাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়ার হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক শিশুকে খুব অল্প বয়সেই উচ্চমাত্রার চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, শিশুরা এখন আগের মতো মাঠে খেলতে যায় না। দিনের বড় একটি সময় তারা স্ক্রিনের সামনে কাটায়। এর ফলে চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে এবং দূরের বস্তু দেখার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, জীবনযাত্রার পরিবর্তনও এই সংকটকে ত্বরান্বিত করছে। মা-বাবার একজন বা দুজনের মায়োপিয়া থাকলে শিশুদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় বই বা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, পর্যাপ্ত সূর্যালোকের অভাব এবং ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটানোও এ সমস্যার অন্যতম কারণ।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপক বলেন, শিশুদের মোবাইল আসক্তি এখন আর শুধু পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক উদ্বেগের বিষয়। পরিবারে সময়ের অভাব, উন্মুক্ত বিনোদনের সংকট এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারা শিশুদের বাস্তব জগত থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মায়োপিয়া একবার শুরু হলে তা পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব নয়। চশমা বা অন্যান্য চিকিৎসার মাধ্যমে এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, কিন্তু স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই সমস্যা বাড়ার আগেই সচেতন হওয়া জরুরি।
তাদের পরামর্শ, শিশুদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বেশি মোবাইল ব্যবহার করতে না দেওয়া, খোলা পরিবেশে খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি করা, নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো এবং পরিবারে প্রযুক্তির পরিবর্তে মানবিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রযুক্তির এই যুগে স্মার্টফোনকে পুরোপুরি দূরে রাখা সম্ভব নয়। তবে সচেতন ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে আজকের পর্দামুখী শৈশব আগামী দিনের এক বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে, এমন আশঙ্কাই করছেন চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা