নিজস্ব প্রতিবেদক :: শিশুদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সিসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে বরিশালে সচেতনতামূলক র্যালি ও প্রচারণা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আয়োজকদের মতে, অপরিকল্পিত সিসা অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিংসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়া সিসা দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকালে "সিসা দূষণ বন্ধ করি, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করি" প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে অশ্বিনী কুমার টাউন হল প্রাঙ্গণ থেকে র্যালির আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী ও পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবাল। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা পিওর আর্থ-এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচি দেশের আটটি বিভাগে চলমান সপ্তাহব্যাপী সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অংশ।
র্যালিটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিবেশকর্মী, সরকারি প্রতিনিধি ও তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অর্ধশতাধিক মানুষ অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীরা সিসা দূষণবিরোধী বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার প্রদর্শন করেন।
কর্মসূচিতে সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—সিসাকে ‘বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য’ হিসেবে ঘোষণা করে সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রণয়ন, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর রক্তে সিসার মাত্রা পরীক্ষার জন্য নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু, অবৈধ সিসা অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং বন্ধে এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (EPR) কার্যকর করা, ব্যবহৃত ব্যাটারির নিরাপদ সংগ্রহ ও পরিবেশবান্ধব পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা এবং সিসা দূষণবিষয়ক গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
আয়োজকরা বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি ভাঙা ও রিসাইক্লিংয়ের ফলে মাটি, পানি ও বাতাসে সিসা ছড়িয়ে পড়ছে, যা শ্রমিক, শিশু এবং আশপাশের জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী সাজিদ মাহমুদ বলেন, “শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সিসা দূষণ শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি শিশুদের অধিকার, জনস্বাস্থ্য এবং সুবিচারের প্রশ্ন।”
বক্তারা জানান, সিসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। দেশে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি শিশুর রক্তে উদ্বেগজনক মাত্রায় সিসা রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও সংশ্লিষ্ট গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি। বিভাগভিত্তিক তথ্যে ঢাকায় ৬৫ শতাংশ, সিলেটে ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ শিশুর রক্তে উচ্চমাত্রার সিসা শনাক্ত হয়েছে।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, অপরিকল্পিত সিসা অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং শুধু শ্রমিক নয়, আশপাশের পুরো জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় তরুণদের সম্পৃক্ততা, স্থানীয় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুর রহমান শুভ বলেন, “সিসা দূষণ প্রতিরোধ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সিসামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং তরুণদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাশ বলেন, শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার বাসনপত্রসহ বিভিন্ন পণ্যে বিষাক্ত সিসার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। তাই সরকারি পর্যায়ে কঠোর নজরদারি, ব্যবহৃত সিসা অ্যাসিড ব্যাটারির নিরাপদ রিসাইক্লিং এবং ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।