
সম্প্রতি রাকিব সিকদার নামে এক ব্যক্তি ২০১৮ সালের ২ আগস্ট ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে তাঁকে শারীরিক নির্যাতন এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। এ ঘটনায় তৎকালীন এসআই দেলোয়ারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করার কথাও জানান তিনি।
তবে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া মানেই তা প্রমাণিত হওয়া নয়। এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রাসঙ্গিক নথিপত্র যাচাই এবং অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা জরুরি।
তদন্ত ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা অনুচিত
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে নির্যাতন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রচার করে কোনো কর্মকর্তার সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকেও গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল থাকতে হবে।
এসআই দেলোয়ারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের দাপ্তরিক নথি, দায়িত্ব পালনসংক্রান্ত তথ্য, জিজ্ঞাসাবাদের রেকর্ড, চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য পরীক্ষা করা যেতে পারে। অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান
সাংবাদিকতা হচ্ছে সত্য অনুসন্ধান ও জনস্বার্থে তথ্য তুলে ধরার দায়িত্বশীল পেশা। তাই কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া সংবাদমাধ্যমের পেশাগত দায়িত্বের অংশ।
এসআই দেলোয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই না করে তাঁকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তা ন্যায়সংগত হবে না। একইভাবে অভিযোগকারী যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তই হোক প্রধান বিবেচ্য। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা থেকে বিরত থাকুক সবাই—এটাই প্রত্যাশা।
এসআই দেলোয়ার জানান , কিছুদিন পরপর একটি মহল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, কি কারনে তাও তিনি জানেন না এ ব্যাপারে পুলিশের ঊর্ধ্বতম কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
প্রসঙ্গ :
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে মাদক কারবারিদের কাছে আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন এসআই দেলোয়ার। তাঁর চাকরিজীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, মাদক উদ্ধারে ভূমিকা এবং অর্জিত পুরস্কার ও পদক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত নির্যাতনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই করে প্রকৃত সত্য তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত থাকাকালে এসআই দেলোয়ার মাদকবিরোধী কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। মাদকদ্রব্য উদ্ধার, মাদক কারবারিদের শনাক্ত করা এবং মাদকবিরোধী অভিযানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন বলে তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন বলেও জানা গেছে। তবে পুরস্কার ও পদকসংক্রান্ত তথ্যের আনুষ্ঠানিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
এসআই দেলোয়ারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছরের শাসনামলে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো মামলা তদন্ত করেননি এবং বাদী হয়েও কোনো মামলা দায়ের করেননি। এমনকি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো নেতাকে গ্রেপ্তার করে মিথ্যা মামলায় আদালতে সোপর্দ করার ঘটনাতেও তিনি জড়িত ছিলেন না বলে তাঁর পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর পক্ষের বক্তব্য, চাকরিজীবনে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তবে এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের মামলা, দাপ্তরিক নথি ও চাকরিসংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।
এসআই দেলোয়ারের চাকরিজীবনে আইজিপি ব্যাজ, পিপিএম এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন-সংক্রান্ত পদক পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব স্বীকৃতি তাঁর পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে কোন পদক কী কারণে এবং কোন সময়ে প্রদান করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি।
তাঁর পক্ষের দাবি, মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সক্রিয় থাকার কারণে তিনি মাদক কারবারিদের বিরাগভাজনও হয়ে থাকতে পারেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগের সঙ্গে এ দাবির সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
বরিশালের পরিচিত মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে আলোচিত ওরিন বাবুর সঙ্গে এসআই দেলোয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে তাঁর পক্ষের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বক্তব্যে দাবি করা হয়, ওরিন বাবু কক্সবাজার থেকে ইয়াবা নিয়ে আসার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় কয়েক মাস আগে মারা গেছেন।
তবে গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট তারিখ, মামলার বিবরণ, গ্রেপ্তারের কারণ এবং ওরিন বাবুর মৃত্যুর তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। কোনো ব্যক্তির সঙ্গে একই মামলায় বা ঘটনায় নাম আসার বিষয়টি একাই অন্য ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করে না। এ ক্ষেত্রে মামলার নথি ও আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা উচিত।
সম্প্রতি রাকিব সিকদার নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, ২০১৮ সালের ২ আগস্ট তাঁকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় তৎকালীন এসআই দেলোয়ারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
অভিযোগটি গুরুতর হওয়ায় এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়। সংশ্লিষ্ট সময়ের দাপ্তরিক রেকর্ড, জিজ্ঞাসাবাদসংক্রান্ত নথি, চিকিৎসার কাগজপত্র, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং এসআই দেলোয়ারের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
এসআই দেলোয়ারের পক্ষের বক্তব্য, তাঁর দীর্ঘ চাকরিজীবনে মাদকবিরোধী কার্যক্রম ছিল অন্যতম প্রধান কাজ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাউকে হয়রানি করার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। তাঁর পেশাগত অর্জন, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার যথাযথ তদন্ত হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি তাঁর পেশাগত অবদান ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।