নিজস্ব প্রতিবেদক :: সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যায় জড়িত জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচী
মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন সেনাবাহিনীর বরখাস্ত কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী ও অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের একাধিক কর্মকর্তা আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, খুন হওয়ার আগে পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বর্বরোচিত ঘটনা নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিলেন তারা। সেই ডকুমেন্টারি প্রকাশের আগেই তাদের হত্যা করে জিয়াউল আহসান এবং মহিলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক রোকেয়া প্রাচী সেগুলো দখলে নেন।
তদন্ত ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, কয়েকটি গুমের ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে র্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা শাখার প্রধান জিয়াউল আহসান অভিনেত্রী ও নাট্য নির্মাতা রোকেয়া প্রাচীর সঙ্গে ২০ বারের বেশি কথা বলেন। এ কথোপকথনের বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে পাওয়া গেছে, সাগর-রুনির হত্যার দুই দিন পর জিয়াউল আহসান তার এক বিশ্বস্ত সহকারীকে রোকেয়া প্রাচীর কাছে পাঠালে তিনি ল্যাপটপে ব্যবহৃত দুটি পেনড্রাইভ দেন। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, এ দুটি পেনড্রাইভে বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৈরি ডকুমেন্টারি ছিল। সাগর ও রুনিকে হত্যার পর এ পেনড্রাইভ দুটি জিয়াউল আহসান যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোকেয়া প্রাচীর কাছে দিয়েছিলেন। দুইদিন পর সেগুলো তিনি আবার ফেরত নেন, এমন তথ্য ওঠে এসেছে তদন্তে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউশন টিম জিয়াউল আহসানের ওই সহকারীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের এক কর্মকর্তা।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। চার দিন পর তদন্তভার দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে। দুই মাসের বেশি সময় তদন্ত করেও ডিবি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় হাইকোর্টের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল তদন্তভার র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দীর্ঘ সময় র্যাবের তদন্তেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাই কোর্ট মামলাটির তদন্ত থেকে র্যাবকে সরিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই টাস্কফোর্সকে ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
হাইকোর্টের নির্দেশের পর ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে। পিবিআই প্রধানকে ওই টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক করা হয়। বর্তমানে এই টাস্কফোর্সের অধীনেই মামলার তদন্ত চলছে।
তবে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না হওয়ায় টাস্কফোর্সকে বেশ কয়েক দফায় সময় দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল হাইকোর্ট আরও ছয় মাস সময় দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটির তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এখন পর্যন্ত সর্বমোট ১২৯ বার পিছিয়েছে।
এ মামলায় বিভিন্ন সময়ে যাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, তারা হলেন- রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, সাগর-রুনির বাসার দুই নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তানভীর রহমান খান।
তানভীর রহমান খান জামিনে রয়েছেন। পলাশ রুদ্র পালও জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর পলাতক রয়েছেন। অন্য আসামিরা কারাগারে আছেন।