দানিসুর রহমান লিমন, বিশেষ প্রতিবেদক :: পারিবারিক কলহের অহেতুক বাহানায় ঢাকার খিলক্ষেতে স্বামী সোহেল সিকদারের পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন বাকেরগঞ্জের মেয়ে জান্নাতুল মাওয়া মুক্তা আক্তার (২৫)। ঘটনার সময় স্ত্রীকে বেধড়ক মারধর করার পাশাপাশি নিজের মোবাইলে সেই নির্মম দৃশ্য ভিডিও ধারণ করেন ঘাতক স্বামী সোহেল।
মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে শোকে পাথর হয়ে যাওয়া মুক্তার মা ও তাঁর অনাথ দুই সন্তানকে সান্ত্বনা দিতে শনিবার বিকেলে বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধল ইউনিয়নের পশ্চিম সরসী গ্রামে নিহতের বাবার বাড়িতে ছুটে যান বিএনপি’র বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন।
সেখানে পৌঁছে তিনি নিহতের বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়া মা এবং অনাথ দুই শিশু সন্তান—সাফওয়ান (৫) ও তাসফিয়া (৪)-কে জড়িয়ে ধরে গভীর সমবেদনা জানান। এ সময় মুক্তার অবোধ শিশুরা ডুকরে কেঁদে উঠে বলে, "বাবাই আমাদের মাকে মেরে ফেলেছে।" অবোধ শিশুদের এই করুণ আর্তি ও স্বজনদের আহাজারিতে সে সময় পুরো এলাকায় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়া শেষে বিএনপি নেত্রী অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন বলেন, মেয়েটিকে মিথ্যা অপবাদ ও যৌতুকের লোভে অন্যায়ভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। ঘাতক স্বামী নিজে নির্যাতন চালিয়েছে আর নিজেই তা মোবাইলে ভিডিও ধারণ করেছে। মূল খুনি গ্রেপ্তার হলেও এ ঘটনার সাথে জড়িত বাকি আসামিদেরও অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। আসামিরা যেন কোনো অবস্থাতেই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে না যায়; ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে।
ঘটনার পেছনের নির্মমতা ও পুলিশের ভূমিকা:
পুলিশ, নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধল ইউনিয়নের পশ্চিম সরসী গ্রামের মৃত নিজাম হাওলাদারের মেজো মেয়ে মুক্তা আক্তারের সাথে প্রায় ৬-৭ বছর আগে বিয়ে হয় ৩নং দাঁড়িয়াল ইউনিয়নের উত্তর কাজলাকাঠি গ্রামের আলতাফ সিকদারের ছেলে সোহেল সিকদারের। পেশার তাগিদে সোহেল পরিবার নিয়ে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে পারিবারিক কলহ ও যৌতুকের দাবির বাহানায় সোহেল তাঁর স্ত্রী মুক্তাকে অমানুষিক নির্যাতন করেন। নির্যাতনের সেই লোমহর্ষক ভিডিও ধারণ করে মুক্তার ভাই তারেক হাওলাদারের মোবাইলে পাঠিয়ে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন ঘাতক সোহেল। তারেক তাঁর বোনকে না মারার জন্য আকুতি জানালেও শেষ রক্ষা হয়নি; মারধরের একপর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মুক্তা।
ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে পরদিন বুধবার সকালে সোহেল খিলক্ষেত থানায় গিয়ে স্ত্রী 'আত্মহত্যা' করেছে বলে নাটক সাজায়। তবে পুলিশের সন্দেহ হলে নিবিড় জেরার মুখে সে স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করে।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই তানভীর হাওলাদার বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার জুম্মার নামাজ পর পারিবারিক কবরস্থানে মুক্তার দাফন সম্পন্ন হয়।
শনিবার বিকেলে নিহতের বাড়িতে বিলকিস জাহান শিরিনের উপস্থিত থাকাকালে আরও উপস্থিত ছিলেন বাকেরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাসির হাওলাদার, দুধাল ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান বাহাদুর এবং দুধল ইউনিয়ন বিএনপির নেতা ও ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলামসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। তারা সকলেই একযোগে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচার দাবি করেন।