রবিউল ইসলাম রবি :: বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর গ্রামের নিখোঁজ ইয়াসমিন আক্তার ওরফে সুমি (২৪) জীবিত না মৃত, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সহ ঘটনাচক্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্লু এড়িয়ে গিয়ে বরিশাল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দায়েরকৃত মামলার আসামিদের পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন বরিশাল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর এসআই বাসুদেব সরকার। সোমবার (৩ আগস্ট) এ চার্জশিটের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার বাদী খাদিজা বেগম (৩৮) ট্রাইব্যুনালে নারাজি দাখিল করলে বিচারক মোহাঃ রকিবুল ইসলাম মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে শোকজ করেন এবং মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
ইয়াসমিনের খোঁজ না পেয়ে হত্যার উদ্দেশ্য অপহরণ বা পতিতালয়ে বিক্রি হয়েছে, এমন অভিযোগ এনে ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট ৫ জনকে আসামি করে বরিশাল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেন নিখোঁজ ভিকটিমের বোন খাদিজা বেগম। দায়েরকৃত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন- বরিশাল পিবিআই-এর এসআই বাসুদেব সরকার। ভিকটিমের মূল তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই না করে আসামিদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
দায়েরকৃত মামলার আসামি হলেন- ইয়াসমিনের স্বামী- নাঈমুল হাসান (২৬) ও তার পিতা-মাতা নুরুল আমিন জোয়ারদার, নাসিমা বেগম সহ বরিশাল নগরীর জিয়া সড়ক এলাকার ভাড়াটিয়া বাসিন্দা জাহিদ হোসেন (২৮) ও সোহেল (২৭)। আসামি নাঈমের বন্ধু জাহিদ ও সোহেল। তার দুইজন বরগুনা বেতাগী উপজেলার বড়ো করুনা গ্রামের বাসিন্দা।
ঢাকা গাজিপুর ‘নারী প্রশিক্ষণ একাডেমি জিরানী’ নামক প্রতিষ্ঠানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেইলার ড্রেস মেকিং-এ প্রশিক্ষণরত অবস্থায় ২০২৫ সালের ২১ থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ছুটির আবেদন করার পর থেকেই ইয়াসমিন নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় নিখোঁজের ভাই হাকিম রনি গত ০৫-০২-২০২৫ তারিখে ঢাকা, গাজীপুর কাশিমপুর থানায় একটি সাধারণ ডাইরি দায়ের করেন। প্রশিক্ষণ সেন্টারের মধ্যে থাকা ইয়াসমিনের কক্ষে পাওয়া যায় একটি চিরকুট। যা হুবহু তুলে ধরা হলো-
“আমি ইয়াসমিন আমার বাসা বরিশাল, আমি সগজ্ঞানে লিখতেছি যে আমি আমার পছন্দে একটা ছেলেকে বিয়ে করছি তার নাম নাঈম হাসান আমার বিয়ের এক বছর হয়ে যাওয়ার পরেও আমার জামাই বা তার পরিবারের কেউ আমার ভরণ পোষনের কোন খরচ দেয়নি উল্টে আমার জামাই আমার থেকে অনেক টাকা নিয়েছে এবং আমার বাসার সব মালামাল তাদের বাড়িতে নিয়েছে, বলেছে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে, গত বছর ফ্রেব্রুয়ারীতে একবার গিয়েছিলাম আমি আমার শশুর বাড়ি তারপর থেকে আমি আমার বাবার বাড়িতে থাকে, আমার জামাই এই এক বছরে আমার কাছ থেকে অনেক টাকা নিছে কিন্তু না সে আমাকে তার কাছে রাখে, না ঠিকমতো যোগাযোগ করে, তাই আমি নিজের ইচ্ছায় নিজেকে শেষ করে দিচ্ছি, আর এর জন্য দায়ী আমার জামাই, ইতি ইয়াসমিন।”
চার্জশিট অনুযায়ী, ইয়াসমিনের ব্যবহৃত বাটন মোবাইল ফোনে মতি রুবি রানীর ব্যবহৃত মোবাইল ০১৩৪৪৯৬০৩১৮ নম্বর ব্যবহার হয়েছে ইয়াসমিনের ৮৬৪৫০১০৬৫১৫১৩৫০ এই আইএমইআই নম্বরের মোবাইলে। মতি রুবি রানীর ভাষ্য, সে মোবাইলটি কিনেছে ফরিদপুর কোতয়ালী অন্তর্ভুক্ত তাজউদ্দিন মাতুডাঙ্গী এলাকার শহিদুল খানের ছেলে সম্রাট খান ওরফে সাইফুল খানের কাছ থেকে। ঘটনাচক্রে, ইয়াসমিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনের এই আইএমইআই নম্বরে রুবি রানীর নম্বর ব্যবহার এবং মোবাইল ক্রয়ের তথ্য প্রমাণ উঠে আসলেও সম্রাট খান মোবাইলটি কোথায় পেয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। বিষয়টি প্রতিবেদনের ১৪ নং অনুচ্ছেদের ৭ নং-এ উল্লেখ রয়েছে।
বাদী বলেন, বাটন মোবাইলের ঘটনাটি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানালে উল্টো সে তাকে মোবাইলটি নিয়ে আসতে বলেন। অথচ বাবুগঞ্জ থানা পুলিশের দেওয়া তথ্যানুযায়ী- ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর নিখোঁজ ইয়াসমিন ও তার স্বামী নাঈমের লোকেশন ছিল মতিমহল জিয়া সড়ক, বরিশাল।
রনি বলেন, ৪ ভাই ২ বোনের মধ্যে ছোট ইয়াসমিন। নিখোঁজ ইয়াসমিনের বর্তমান অবস্থান সহ তার বৈধভাবে ক্রয় করা ব্যবহৃত স্মার্টফোনের তথ্য, নিখোঁজের পর নাঈম ও ইয়াসমিনের লোকেশনে একই অবস্থানে ছিল, বিবাহের পর সন্তান নষ্ট করার প্রমাণপত্র দেওয়া হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা এ সব তথ্যগুলো নেয়নি। ইয়াসমিন নিখোঁজ হওয়ার আগে পরে কোন কোন নম্বরে যোগাযোগ করেছে তাও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেনি। বাবার পরিবারের সাথে ইয়াসমিনের তেমন ভালো সম্পর্ক খারাপ ছিল- চার্জশিটে এ তথ্য মিথ্যা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর গ্রামের মো. হাসান হাওলাদারের মেয়ে এবং নিখোঁজ সুমি ও বাদি খাদিজা বেগম (৩৯) এবং ছেলে রনি।