নিজস্ব প্রতিবেদক :: "সরকারি কাজ করতে সময় লাগে, কিন্তু বিল হতে সময় লাগে না"—এমন ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন মহলে। কারণ, অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুলকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজের বাস্তব অগ্রগতির তুলনায় কাগজে-কলমে অগ্রগতি অনেক বেশি দেখানো হয়েছে। কোথাও কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ, কোথাও ভুয়া বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাউচার, আবার কোথাও সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। একই সঙ্গে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, ঠিকাদারদের হয়রানি, জামানতের টাকা ফেরত দিতে অনৈতিক সুবিধা দাবি এবং বিল ছাড়ে অনিয়মের অভিযোগও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, যথাযথ কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন, ভুয়া হিসাব-নিকাশ এবং সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনের মতো গুরুতর বিষয়গুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু একটি দপ্তরের নয়, বরং পুরো সরকারি উন্নয়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘কাজ কোথায়?’—উত্তর খুঁজছে অভিযোগপত্র
অভিযোগের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, প্রকল্পের বাস্তব কাজের তুলনায় কাগজপত্রে অগ্রগতির চিত্র নাকি অনেক বেশি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু প্রকল্পে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কাজের আগেই বিল উত্তোলনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি প্রকল্পে আগে কাজ হয়, নাকি আগে বিল?
স্থানীয়দের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য জনগণের সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি প্রকল্পের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে কাগজে-কলমের হিসাব না মেলে, তাহলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ঠিকাদারদের অভিযোগ—‘কাজের চেয়ে চাপ বেশি’
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছে বিল ছাড়, কার্যাদেশ প্রদান এবং জামানতের অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা চাওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দাবি করা অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিল আটকে রাখা, অযথা কাগজপত্রে জটিলতা সৃষ্টি, কাজ বাতিলের ভয় দেখানো কিংবা দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে রাখার মতো অভিযোগও রয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
সরকারি অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতিটি টাকার সঙ্গে জনগণের করের অর্থ জড়িত। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়মনীতি অনুসরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিযোগগুলো যদি ভিত্তিহীন হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নথিপত্র প্রকাশ করে বিষয়টি পরিষ্কার করা। অন্যদিকে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
তদন্তই পারে দূর করতে সব প্রশ্ন
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজন হলে প্রকল্পের আর্থিক নিরীক্ষা, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
বিদায়ের প্রাক্কালে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘিরে এতগুলো অভিযোগ সামনে আসা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—সেটি নির্ধারণ করবে তদন্ত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সরকারি প্রকল্পে সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত কাজের মান, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং জনগণের আস্থা;
বিলের অঙ্ক বা কাগজের হিসাব নয়।
সরকারি হিসাবের খাতায় যতই অঙ্ক মিলুক না কেন, মাঠের বাস্তবতা যদি তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে দায়িত্বশীলদেরই। স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়েই কেবল দূর হতে পারে এই বিতর্ক এবং পুনরুদ্ধার হতে পারে জনগণের আস্থা।
এ ব্যাপারে একাধিকবার ফোন দিলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম রিসিভ করেননি, যার কারনে তার বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয়নি।