নিজস্ব প্রতিবেদক :: তাজা মাছের চড়া দাম : কেন ‘ঘুষের বাজার’ নামে পরিচিত বরিশালের চৌমাথা বাজার?
বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী চৌমাথা বাজার। এক শতাব্দী ধরে বরিশালবাসীর তাজা মাছ ও সবজির চাহিদা মিটিয়ে আসছেন এ বাজারের ব্যবসায়ীরা। তবে বাজারটিতে উচ্চমূল্য নিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিতর্ক। আর এ কারণে বাজারটি ‘ঘুষের বাজার’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। বলা হয়ে থাকে, শুধু বিত্তবান ও যাদের বাড়তি আয়ের সুযোগ আছে, তারাই এ বাজারে কেনাকাটা করে থাকেন। এ জনশ্রুতি থেকেই কালক্রমে বাজারটির নাম হয়ে যায় ‘ঘুষের বাজার’। আর এ তকমার নেতিবাচক প্রভাব বাজারটির দীর্ঘ বছরের জৌলুস ও ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
জানা গেছে, বরিশাল নগরীর হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা এলাকায় পাকিস্তান আমলে এ বাজারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরুর দিকে মাত্র চারজন মৎস্য ব্যবসায়ী ছিলেন চৌমাথা বাজারে। আজ সেখানে খুচরা ব্যবসায়ী শতাধিক এবং আড়তদার আছেন আটজন।
প্রতিদিন বিকেল ৫টার পর থেকে এ বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগম শুরু হয়, কেনাবেচা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। রাত প্রায় দেড়টা থেকে দুইটা পর্যন্ত। এ কারণে বাজারটি ‘নৈশ বাজার’ হিসেবেও অনেকের কাছে পরিচিত। ক্রেতা-বিক্রেতারা বলছেন, চৌমাথা বাজারে নদ-নদীর বড় বড় তাজা মাছ, সবজি, মাংস, মুরগি, ডিম ও নানারকম মসলা—সবকিছুই পাওয়া যায়; কিন্তু বরিশাল নগরীর অন্য যে কোনো বাজারের চেয়ে এই বাজারে পণ্যমূল্য অনেক বেশি। বিশেষ করে এখানকার মাছ বাজারে মূল্যের অস্থিরতা সব সময় সমান। কেননা, অন্য বাজারের তুলনায় এ বাজারে মাছের দাম মণপ্রতি মূল্যের ব্যবধান দাঁড়ায় দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। যে কারণে এ বাজার থেকে মাছ-সবজি কেনা অনেকটা স্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য। তার পরও প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতবদল হয় চৌমাথা বাজারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ বাজারের ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে মাছ এবং সবজি উচ্চমূল্যে বিক্রি করেন। তাদের বিশ্বাস, যাদের আর্থিক অবস্থা খুব ভালো এবং বাড়তি আয়ের সুযোগ আছে, তারাই এ বাজারের ক্রেতা। কেউ কেউ বলছেন, এ বাজারের বড় মাছ উপঢৌকন হিসেবেও যাচ্ছে এলিট শ্রেণির ঘরে। এ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই বাজারটি এখন ‘ঘুষের বাজার’ নামে পরিচিত।
জানা গেছে, ২০১৯ সালে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ছিলেন প্রলয় চিসিম। চৌমাথা বাজারে মাছ কিনতে গিয়ে উচ্চমূল্যের কারণে ফিরে আসেন তিনি। সে সময় বাজারটির নামের সঙ্গে তকমা লাগিয়ে দেন ‘ঘুষের বাজার’। ওই সময় এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে সাবেক এই অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার নিজেই ঠাট্টাছলে কথাটা বলেছিলেন সবার সামনে: ‘যাদের ঘুষের টাকা আছে তারাই এই বাজার থেকে মাছ কিনতে পারে। এ কারণে আমি এটির নাম দিয়েছি ঘুষের বাজার।’ তবে ২০১৯ সালে নয়, চৌমাথার এই বাজারটি ‘ঘুষের বাজার’ নামে পরিচিতি পায় আরও অন্তত ১৫-২০ বছর আগে। তার এ তকমার কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারে।
বাজারটিতে সর্বপ্রথম যে চারজন ব্যবসায়ী ছিলেন তাদের মধ্যে তিনজনই মৃত্যুবরণ করেছেন অনেক আগেই। তারা হলেন জিতু, কিরণ বাবু ও আজমল। শুধু বেঁচে আছেন মো. শাহজাহান মিয়া। বর্তমানে তিনি ওই বাজারের আটজন আড়তদারের মধ্যে একজন। মো. শাহজাহান মিয়া জানান, প্রায় অর্ধশত বছর আগে হাতেম আলী কলেজের সামনে তারা চারজন মাছের ব্যবসা করতেন। পরে মহাসড়কের পাশে একটি স্টলের মধ্যে তাদের এই ব্যবসা চলছিল। পরবর্তী সময়ে পাশেই বিলের মধ্যে বর্তমান বাজারটি স্থাপন করে সিটি করপোরেশন। তিনি বলেন, বাজারটির অনেক নামডাক ছিল। মাত্র ২০ বছর আগেও ঢাকা থেকে বড় ব্যবসায়ীরা আসতেন এ বাজারে। তারা বাজারে এসে একসঙ্গে পুরো মাসের মাছ কিনে নিতেন। এখনো মাঝেমধ্যে অনেকে আসেন। এ কারণে স্থানীয় অনেকে বাজারটিকে ‘ঘুষের বাজার’ বলে অপপ্রচার শুরু করে। বাস্তবে তেমনটি না। একই কথা বললেন মাছ ব্যবসায়ী আরিফুর রহমান জিহাদ। তিনি বলেন, বরিশালের সব বাজার ঘুরেও যে মাছ পাওয়া যাবে না, তা এই বাজারে পাবেন। তাও একদম স্থানীয় নদ-নদীর তাজা মাছ। আর ভালো মাছ কিনতে হলে দাম একটু বেশি দিতেই হয়। যখন কেউ বেশি দামে তাজা মাছ কিনতে পারে না, তখন বলে ‘ঘুষের বাজার’। এটা বলে তারা বাজারের ঐতিহ্য ধ্বংস করে ফেলেছে। আগের মতো এখন আর ক্রেতাও আসে না। কিছু মানুষের অপপ্রচারের কারণে আমরা এখন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। অন্য বাজারের তুলনায় চৌমাথা বাজারে মাছের দাম বেশি হওয়ার কথা স্বীকার করলেন আরেক মাছ ব্যবসায়ী বাইজিদ শাহ। তবে অন্য বাজারগুলোর তুলনায় এ বাজারের মাছের মান অনেক ভালো বলে দাবি এ ব্যবসায়ীর। বাইজিদ বলেন, ‘এই বাজারে আমি ২১ বছর মাছের ব্যবসা করি। এ বাজারের মাছ সবচেয়ে ভালো। অন্য বাজারগুলোতে দেখা যায়, ১০ পিস মাছ কিনলে ভেতরে একটি খারাপ মাছ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের এখানে সে সুযোগ নেই, যে কারণে মাছটার ভালো দামও একটু বেশি নেওয়া হয়। এজন্য ঢাকা থেকেও লোক এখানে এসে মাছ নিয়ে যায়। এখানে বরফ ছাড়াও পাওয়া যায়, বরফ দেওয়া মাছও পাওয়া যায়।’
স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, অনেক বছর আগে দেখা যেত, এক মাস পরে এসে লাখ লাখ টাকার মাছ একজনেই কিনে নিয়েছেন। এ কারণে অনেকেই চোখে পড়েছেন। তাই বলছে ‘ঘুষের বাজার’ বা কাউকে ‘ঘুষ’ দেওয়ার জন্য মাছ কিনে নেওয়া হয়েছে।
অপর ব্যবসায়ী মো. জিহাদ বলেন, কিছু মাছ আছে যা অন্য বাজারে পাওয়া যায় না। কিন্তু এ বাজারে সব সময় নদী-সাগর, বিল—সব ধরনের মাছ পাওয়া যায়। বিশেষ করে এই বাজারে সব সময় ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। এ কারণে এখানে মাছের দামও একটু বেশি। ব্যবসায়ী মো. রুবেল বলেন, মাছ একদামে বেচা যায় না। দর-দাম করে বেচাকেনা হয়। যিনি বুঝে কিনতে পারেন, তার কাছে দাম কম। যিনি বুঝে কিনতে পারেন না, তিনিই ‘ঘুষের বাজার’ বলে অপপ্রচার চালান। অন্যদিকে মাছবাজারের নিয়মিত ক্রেতা জুলিয়েট বলেন, চৌমাথা এলাকার আশপাশে বাসা হওয়ায় এখান থেকেই সব সময় বাজার করা হয়। মাছের যখন যেমন দাম হয়, সেভাবেই রাখা হয়। বেশিরভাগ সময় চিংড়ি মাছ কেনা হয়—কখনো ৭শ টাকা, আবার কখনো ১২শ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। যখন মাছের আমদানি বেশি, দামও তখন কম থাকে। আরেক ক্রেতা রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘বরিশালের অন্য বাজার থেকে কেনাকাটা করি। অন্য বাজারের চেয়ে এ বাজারে মাছের দাম কিছুটা বেশি। তার পরও চৌমাথা বাজারেই বেশি আসি। কারণ এই বাজারে মাছটা তাজা পাওয়া যায়। আর তাজা খেতে হলে দাম তো একটু বেশি দিতে হবেই।’ ক্রেতা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আসলে মানুষের ভুল ধারণা—এটা ঘুষের বাজার। মূলত এখানে স্বচ্ছ নদীর তাজা মাছ পাওয়া যায়, দাম একটু বেশি। অনেকে আছে, বাজারে এসে দাম যা চায়, তাই দিয়ে নিয়ে যান। এতে অন্যরা মনে করেন, টাকাটা মনে হয় অবৈধভাবে উপার্জিত; যে কারণে এসেই দাম-দর না করে কিনে নিয়ে যায়। এজন্য বলে যে, এটা ‘ঘুষের বাজার’। আসলে এগুলো সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এদিকে, শুধু মাছের বাজার নয়, ‘ঘুষের বাজার’ খ্যাত সবজির বাজারেও অন্য বাজারের তুলনায় দামের বড় তফাত। অন্য বাজারের তুলনায় প্রকারভেদে সবজির দাম অন্তত ১০-২০ টাকা বেশি রাখা হয় বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. সাকিব বলেন, দেখা যায় কিছু সবজির দাম বেশি হয়। আমরা আড়ত থেকে পণ্য বাছাই করে আনি। এ কারণে ১০-১৫ টাকা করে বেশি দাম দিতে হয়। এজন্য ক্রেতাদের কাছ থেকেও কিছুটা বেশি রাখা হয়। তবে সেটা সব ক্ষেত্রে নয়। অন্য বাজারের সবজির দাম আর আমাদের চৌমাথা বাজারের সবজির দাম একই।
বাজারের সবচেয়ে পুরোনো মাংস বিক্রেতা মো. মামুন সিকদার বলেন, ‘একসময় বাজার জমজমাট ছিল। এখন মাছের দামটা একটু বেশি হওয়ায় আগের জৌলুস নেই। এখন তেমন ক্রেতা আসে না। আগে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে বড় বড় কাস্টমার আসত। এখন নামের কারণে আর আসে না।’
বাজারের মুরগি ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম স্বপন বলেন, ‘এটাকে ঘুষের বাজার বলাটা ভুল। কারণ এখানে মাছ তাজা পাওয়া যায়, এ কারণে দাম একটু বেশি। বরিশাল বিভাগের মধ্যে যত বড় মাছ আছে, সব তাজা মাছ এই চৌমাথা বাজারে পাওয়া যায়, যা অন্য বাজার ঘুরে পাওয়া যায় না। এজন্য দাম একটু বেশি হয়। এ ছাড়া মুরগি, মাংস, ডিম, মসলা সবকিছুর দাম অন্য বাজারে যা এখানেও তা। বাজারের ইজারাদারের ভাই মো. এনামুল হক বলেন, চৌমাথা বাজারে একশর বেশি ব্যবসায়ী আছেন। এখানে চন্দ্রমোহন, মুলাদী, মেহেন্দীগঞ্জ, লাহারহাট, কাজিরচর, দোয়ারিকা, উজিরপুর, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, সাতক্ষীরা, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে মাছ আসে। তিনি বলেন, ভালো মাছের দাম একটু বেশিই হবে। এখানে যে মাছ পাওয়া যায়, এমন অন্য বাজারে পাওয়া যাবে না। খারাপ মাছ আমরা বাজারে ঢুকতেই দিই না। আমাদের বাজারের বদনাম হবে, এটা আমরা কখনো চাই না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বরিশাল জেলার সদস্য কবি হেনরী স্বপন বলেন, শহরের চৌমাথা বাজার কখনো সাধারণ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের বাজার নয়। এই বাজারটি কালক্রমে ঘুষের বাজারে পরিণত হয়েছে। এ বাজারে সমস্ত জিনিস পাওয়া যায় বটে; কিন্তু এই বাজারের পণ্য সাধারণ মানুষের কেনাকাটার বাইরে একটি বাজারে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর দেখা যায় এই বাজারে যারা এলিট শ্রেণির লোকজন আছে—বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, তাদের পিয়ন বা সরকারি কর্মকর্তারা এসে এখানে বাজার করে। এ বাজার থেকে যে পণ্য ক্রয় করা হয়, দেখা গেছে কোনো এলিট শ্রেণির লোকের বাসায় উপঢৌকন হিসেবে দেওয়া হয়। এ কারণে পর্যায়ক্রমে এটি ‘ঘুষের বাজারে’ পরিণত হয়েছে। কিন্তু সরকারি লোকজন যারা আছেন, ভোক্তা অধিকার বা বাজার পরিদর্শন সংশ্লিষ্ট যারা রয়েছেন তারা কেউ এখানে এসে মনিটরিং করেন না। আমার মনে হয় বিষয়টি সরকারের যারা কর্মকর্তা, তাদের অচিরেই এ বাজারে নজর দেওয়া উচিত যে, অতিরিক্ত দাম এবং অতিরিক্ত যে টাকা মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিওয়া হচ্ছে, এটি দেখা উচিত। বরিশাল সিটি করপোরেশনের নগর ভবন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় শতবর্ষী এই বাজারটির নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বরিশাল সিটি করপোরেশন। ১৯৬৩-৬৪ অর্থবছরে কাঁচা বাজারের জন্য বর্তমান চৌমাথা বাজারের জায়গা অধিগ্রহণ করে তৎকালীন বরিশাল পৌরসভা। প্রতি বছর বাজারটি ইজারা দেওয়া হয়। তবে আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে চলতি অর্থবছরে বাজারটি নতুন করে ইজারা দেয়নি নগর প্রশাসন। বর্তমানে বাজারটির ইজারাদার বরিশাল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মশিউর রহমান মঞ্জু। তিনি লোকসানের অজুহাতে আদালতে মামলা করে ইজারা কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ পেয়েছেন। ঘুষের বাজার নামে পরিচিত বরিশাল নগরীর চৌমাথা বাজারে উচ্চমূল্যে বেচাকেনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার। তিনি বলেন, হতে পারে কেউ বা কোনো ব্যক্তি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা, আমাদের ভোক্তা অধিকার, বাজার মনিটরিং এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষ যারা রয়েছে তাদের নিয়ে অচিরেই এই চৌমাথা বাজারে অভিযান পরিচালনা করব। দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা যায়, পাশাপাশি কেউ যেন সিন্ডিকেট করে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে কৃত্রিমভাবে সংকট এবং দাম বাড়াতে না পারে সে ব্যাপারে আমরা প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’