নিজস্ব প্রতিবেদক :: বিদ্যালয় আছে, শিক্ষার্থী আছে এবং শিক্ষকও আছেন, কিন্তু নেই প্রধান শিক্ষক। বরিশাল বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর একটি বড় অংশে এভাবেই খুঁড়িয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। বিভাগের মোট ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। অর্থাৎ প্রতি ১০টি বিদ্যালয়ের প্রায় চারটিই চলছে নেতৃত্বহীন অবস্থায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সহকারী শিক্ষকের তীব্র সংকটও। বিভাগের ছয় জেলায় সহকারী শিক্ষকের ৩ হাজার ২৯টি পদ শূন্য রয়েছে।
শুধু স্কুলেই নয়, প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থাতেও দেখা দিয়েছে বড় জনবল সংকট। ছয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৭০টি পদের মধ্যে ৩১টি এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতে ৫৩৯টি পদের মধ্যে ৩১৩টিই শূন্য। ফলে বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান এবং প্রশাসনিক তদারকি—প্রাথমিক শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ তিন স্তরেই তৈরি হয়েছে স্থবিরতা।
বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষার উপপরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক বরিশাল জেলায়। জেলার ১ হাজার ৫৮৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৩৩টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়া।
উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে এই সংকটের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট। আগৈলঝাড়ায় ৯৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০টিতে, উজিরপুরে ১৮১টির মধ্যে ১১১টিতে, গৌরনদীতে ১৩১টির মধ্যে ৯০টিতে, বরিশাল সদরে ২০১টির মধ্যে ৭২টিতে, বাকেরগঞ্জে ২৭৯টির মধ্যে ১৮১টিতে, বানারীপাড়ায় ১২৬টির মধ্যে ৮৭টিতে, বাবুগঞ্জে ১৩৪টির মধ্যে ৭৬টিতে, মুলাদীতে ১৩৯টির মধ্যে ৯০টিতে, মেহেন্দীগঞ্জে ২০৮টির মধ্যে ১১৩টিতে এবং হিজলায় ৯২টির মধ্যে ৫৩টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
বিভাগের অন্য পাঁচ জেলাতেও চিত্র একই রকম। পটুয়াখালীর ১ হাজার ২৩৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯১টিতে, পিরোজপুরের ৯৮৯টির মধ্যে ৩৪০টিতে, ভোলার ১ হাজার ৪৭টির মধ্যে ৪২৮টিতে, বরগুনার ৭৯৯টির মধ্যে ৩০৬টিতে এবং ঝালকাঠির ৫৮৫টির মধ্যে ২০৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই।
তবে শূন্য পদ থাকলেও সব বিদ্যালয় যে একেবারে অভিভাবকহীন, তা নয়। বিভাগের ৩ হাজার ৬৪৪টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন অন্য শিক্ষকেরা। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১৪ জন রয়েছেন ‘চলতি দায়িত্বে’। অর্থাৎ স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতির বদলে বছরের পর বছর ধরে অস্থায়ী ব্যবস্থা দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে।
প্রধান শিক্ষক শুধু একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধান নন; শিক্ষকরা নিয়মিত আসছেন কি না, পাঠদান ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি কেমন এবং বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বজায় থাকছে কি না—এসবের মূল তদারককারী তিনি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহকারী শিক্ষকের সংকট। ছয় জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৩৩ হাজার ১২৩টি। বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩০ হাজার ৯৪ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৩ হাজার ২৯টি পদ। এর মধ্যে বরিশালে ৬২৯টি, পটুয়াখালীতে ৭৭৫টি, পিরোজপুরে ৪৯৬টি, ভোলায় ৪৬৪টি, বরগুনায় ৩৮০টি এবং ঝালকাঠিতে ২৮৫টি পদ খালি।
অর্থাৎ কোথাও প্রধান শিক্ষক নেই, কোথাও সহকারী শিক্ষক কম, আবার কোথাও দুটি সংকটই একসঙ্গে বিদ্যমান। এতে কর্মরত শিক্ষকদের ওপর কাজের চাপ বাড়ছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, নিয়মিত পাঠদান এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বাড়তি যত্ন নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। ২০১৭ সালে কিছু জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের স্থায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে অনেকেই অবসরে গেছেন বা মারা গেছেন, কিন্তু নতুন করে পদোন্নতির কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়েছে। তদারকির অভাব ও শিক্ষকসংকটের কারণে পাঠদানের মান নিশ্চিত করা কঠিন হচ্ছে। দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে এসব শূন্য পদ পূরণ করা না হলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
স্কুলের বাইরে তদারকি সংস্থাতেও জনবল সংকট প্রকট। বিভাগের ছয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৭০টি পদের বিপরীতে মাত্র ৩৯ জন কর্মরত, শূন্য ৩১টি পদ। উপজেলা শিক্ষা অফিসগুলোতে ৫৩৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২২৬ জন, অর্থাৎ ৩১৩টি পদই ফাঁকা। এমনকি বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয়েও ১৪টি পদের মধ্যে ৫টি পদ খালি রয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, যাদের ওপর তদারকির দায়িত্ব, তাদেরই যদি বড় অংশ অনুপস্থিত থাকে, তবে বিদ্যালয় পরিদর্শনের কার্যকারিতা ও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) বরিশাল জেলার সাধারণ সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেন, এটি কেবল শূন্য পদের পরিসংখ্যান নয়, এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে একটি পুরো প্রজন্মের শিক্ষার ওপর। দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা অফিসের শূন্য পদগুলো পূরণ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নাগরিক গড়ার প্রাথমিক স্তরে এমন অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর মো. জাহিদুল কবির তুহিন জানান, পুরো বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।