
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের নিউরোমেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অমিতাভ সরকারের বিরুদ্ধে রোগীদের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া, বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানে রোগী পাঠানো, চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিপরীতে কমিশন গ্রহণ এবং সরকারি কর্মঘণ্টায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা দেওয়াসহ নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে রোগীদের সেখানে চিকিৎসা, ভর্তি ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠান। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে রোগীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি মো. মাসুম নামে এক ব্যক্তি এসব অভিযোগ তুলে স্বাস্থ্য সচিব ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে ডা. অমিতাভ সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
লিখিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বরিশালের বেলভিউ হাসপাতাল অ্যান্ড মেডিকেল সার্ভিসেস, রাহাত আনোয়ার হাসপাতাল ও কেএমসি হাসপাতালের সঙ্গে ডা. অমিতাভ সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগকারী দাবি করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ডা. অমিতাভ সরকারের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগীকে বিভিন্ন সময় এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়া কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। গুরুতর অসুস্থতা না থাকলেও কিছু রোগীকে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে সিটি স্ক্যান, এমআরআইসহ ব্যয়বহুল বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর ক্ষেত্রে রোগীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, রোগীদের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে পাঠানোর মাধ্যমে চিকিৎসকের কমিশন পাওয়ার একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। শুধু সিটি স্ক্যান বা এমআরআই নয়, অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট হারে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগপত্রে কমিশন লেনদেনের বিষয়টি আড়াল করতে ‘লেস’ শব্দ ব্যবহার করারও অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগকারী দাবি করেছেন, রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে যে কমিশন বা আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়, তার একটি অংশকে ‘লেস’ হিসেবে টেস্ট স্লিপে উল্লেখ করে রোগীকে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়। এর মাধ্যমে কমিশন গ্রহণের বিষয়টি রোগীদের কাছে অন্যভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি করানোর পরও কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডা. অমিতাভ সরকারের বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কোনো রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর তার বেড ভাড়া ও চিকিৎসাসেবা বাবদ নির্দিষ্ট হারে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়। প্রতি রাউন্ডের জন্যও নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া সুস্থ বা অতিরিক্ত ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন নেই—এমন রোগীদেরও নির্দিষ্ট ফিজিওথেরাপি সেন্টারে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। রোগীদের ওইসব প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর বিনিময়ে কমিশন নেওয়া হয় বলেও অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।
ডা. অমিতাভ সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—সরকারি কর্মঘণ্টার মধ্যেই বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা দেওয়া।
অভিযোগকারীর দাবি, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরকারি দায়িত্ব পালন করার সময়ও তিনি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখেন। এতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি দালালচক্র কাজ করে। এসব দালালের মাধ্যমে রোগীদের নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো দালালের নাম বা নির্দিষ্ট প্রমাণ অভিযোগপত্রের বাইরে প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
ডা. অমিতাভ সরকারের বিরুদ্ধে বেলভিউ হাসপাতাল অ্যান্ড মেডিকেল সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা ও শেয়ার সংক্রান্ত বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, হাসপাতালটির একটি বৈধ কমিটি তার প্রভাবের কারণে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তিনি হাসপাতালটির চেয়ারম্যান হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া হাসপাতালের শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে বেলভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা, কমিটি কিংবা শেয়ার মালিকানার বিষয়ে ডা. অমিতাভ সরকারের সরাসরি মালিকানা বা সংশ্লিষ্টতার কোনো নথি অভিযোগের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগপত্রে ডা. অমিতাভ সরকারের আয়কর নথি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, তার আয়কর নথি অডিটের সময় কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছিল। পরবর্তীতে একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়।
তবে আয়কর-সংক্রান্ত এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো সরকারি নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারী।
ডা. অমিতাভ সরকারের বিরুদ্ধে ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আর্থিক কিংবা অন্যান্য সুবিধা নেওয়া হয়ে থাকে। যদিও এ অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা কোনো কোম্পানির নাম অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
অভিযোগকারী এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
লিখিত অভিযোগে সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, শেয়ার ক্রয়, রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে কমিশন গ্রহণ, ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং সরকারি কর্মঘণ্টায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারী ডা. অমিতাভ সরকারকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বদলি এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি জানিয়েছেন।
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ একবাক্যে অস্বীকার করেছেন ডা. অমিতাভ সরকার।
তিনি বলেন, “আমি আমার নামে বেলভিউ কিংবা কেএমসি হাসপাতালে কোনো শেয়ার নেইনি। রোগীদের পরীক্ষার কমিশনের কোনো টাকা আমি নিই না। রোগীদের ডিসকাউন্ট দেওয়ার জন্যই আমি বিষয়টি বলে থাকি।”
ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করে তিনি বলেন, “ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না।”
সরকারি কর্মঘণ্টায় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগের বিষয়ে ডা. অমিতাভ সরকার বলেন, “শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে আমি যথাযথ সার্ভিস দিই।”
বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে যাই দুপুর দুইটার পরে।”
তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. অমিতাভ সরকার বলেন, “আমার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ দিয়েছে—এমন কোনো তথ্য আমি জানি না।”
ডা. অমিতাভ সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে কিছু অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এর সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে সরকারি কর্মঘণ্টায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা, রোগীদের নির্দিষ্ট হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো, পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিপরীতে কমিশন নেওয়া এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা সরকারি চিকিৎসাসেবা ও রোগীর স্বার্থের জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।
তবে অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। ডা. অমিতাভ সরকার তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের সময়সূচি যাচাই করা প্রয়োজন।
এখন দেখার বিষয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিংবা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) অভিযোগটি কীভাবে বিবেচনা করে এবং এ বিষয়ে কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না।