নিজস্ব প্রতিবেদক :: একসময় সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল। সেখানে এখন চরম অব্যবস্থাপনা ও দখল রাজত্ব কায়েম করেছে একটি মহল। ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বরিশালে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত প্রায় ৫০ একর জমিতে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। একই জায়গায় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্মরণে একটি নিমগাছও রোপণ করেছিলেন তিনি। প্রতিহিংসার রাজনীতিতে সেখানে আর বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি। আর প্রায় দুই দশক পর সেই জমিকে ঘিরে নতুন করে দেখা দিয়েছে মালিকানার প্রশ্ন। একটি গোষ্ঠী নিজেদের মালিক দাবী করে রীতিমতো দখল করে নিয়েছে অর্ধেকের বেশি জমি। সম্প্রতি তাদের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের চেষ্টা বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও বরিশাল সিটি করপোরেশন। যিনি নির্মাণকাজ করছিলেন, সেই সাবেক কাউন্সিলর নুরুল ইসলাম দাবি করছেন, রাস্তার পাশের ২৫ শতাংশ জমি তার ব্যক্তিমালিকানাধীন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জায়গাটি সরকারি খাসজমি।
প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একসময় নির্ধারিত এই খাসজমি আসলে কার?
বরিশাল নগরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সোনামিয়ার পুল বাজারের পেছনে নাসির মডেল টাউন সংলগ্ন ডেফুলিয়া মৌজায় গিয়ে এমনই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি ডেফুলিয়া মডেল টাউনের জমিও রয়েছে এই প্রশ্নের ভিতর। ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জায়গায় নতুন করে একটি ফলক স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে খালেদা জিয়ার ছবি ও ভিত্তিপ্রস্তর লেখা নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, গত শুক্রবারও সেখানে এ ফলক ছিল না। তাদের ভাষ্য, মূল ভিত্তিপ্রস্তরটি অনেক আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছিল। পরে মহানগর বিএনপি নেত্রী আফরোজা নাসরীন এসে এই ফলকের উপরে খালেদা জিয়ার ছবি সম্বলিত ব্যানার লাগিয়ে দেন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের সহায়তায় নতুন করে লাল পতাকা দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলকের পাশে এখনো দাঁড়িয়ে আছে খালেদা জিয়ার রোপণ করা সেই নিমগাছটি।
নিমগাছটির পাশেই বড় বড় গর্ত খোঁড়া হয়েছে। সেখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে বোঝা যায়। মাঠের বিভিন্ন জায়গায় পড়ে আছে ইট, বালু ও খোয়ার স্তূপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে সীমানাপ্রাচীর ও স্টোররুম বা গোডাউন নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছিল। দুই দিন কাজ চলার পর স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ডেফুলিয়া মৌজায় প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত সরকারি খাসজমির পরিমাণ প্রায় ৫০ একর। এই জমির একটি অংশে সম্প্রতি সীমানাপ্রাচীর ও স্টোররুম নির্মাণের চেষ্টা করা হয়। দুই দিন কাজ চলার পর স্থানীয় বাসিন্দারা গিয়ে তা বন্ধ করে দেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম, মজিবর ও সোহেল সহ কয়েকজন বলেন, সোনামিয়ার পুল বাজারের পেছনে ডেফুলিয়া মৌজায় প্রায় ৫০ একর খাসজমি রয়েছে। ওই জমির একটি অংশে স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করা হলে বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয়রা সেখানে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। তবে প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় এটি চোখে পড়েছে, ভিতরের বেশিরভাগ জায়গা বেদখল হয়েছে বলে জানান তারা।
বরিশাল মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা নাসরীন বলেন, এটি সম্পূর্ণ সরকারি খাসজমি। এখানে ৫০ একর জমিতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির জন্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এটি তাঁর স্মৃতিবহ জমি। ২০ থেকে ২৫ শতাংশ জমি ইতিমধ্যেই বেদখল হয়েছে। এগুলো উদ্ধার করে এখানে বেগম খালেদা জিয়ার নামে একটি সরকারি হাসপাতাল নির্মাণের দাবী করেন বিএনপির এই নেত্রী।
এদিকে এলাকাবাসী জমির মালিকানা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সেখানে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
যদিও এই জমিতে নিজের অধিকার দাবী করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাবেক কাউন্সিলর নুরুল ইসলাম বলেছেন, রাস্তার পাশের ২৫ শতাংশ জমি তাঁর। জমিটি খাস নয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন। সেখানে স্টল নির্মাণের জন্য সীমানা প্রাচীর দেওয়া হচ্ছিল। সিটি করপোরেশনের কর্মীদের নির্দেশে আপাতত কাজ বন্ধ রেখেছেন তিনি। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র দেখতে চেয়েছে, আমি বৈধ কাগজপত্র দেখিয়ে আবারও কাজ শুরু করবো বলে জানান তিনি।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা দেখেছেন, পরিকল্পনা বা অনুমোদনের বাইরে স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জমিটি খাস বলে জানিয়েছেন। এ কারণে কাজ বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জমির কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের প্রস্তাবিত ২০টি খেলার মাঠের মধ্যে ডেফুলিয়াতেও একটি মাঠ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সম্প্রতি বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরীন ডেফুলিয়ায় গিয়ে খালেদা জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি একটি খেলার মাঠ ও আধুনিক হাসপাতাল করার প্রস্তাব দিয়েছেন। বিলকিস জাহান শিরীন বলেন, ডেফুলিয়ায় স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বরিশাল জজ আদালতের পিপি এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডেফুলিয়ার বর্তমান বিরোধকে শুধু ২৫ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ হিসেবে দেখলে এর বড় একটি পটভূমি বাদ পড়ে যায়। এটি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতি বিজড়িত স্থান। এখানে সরকারিভাবে হাসপাতাল অথবা কোনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হবে এটাই প্রত্যাশা আমাদের। সরকারি খাসজমি এভাবেই দখল করে নিচ্ছে ভূমিদস্যুরা। তাদের থেকে এই জমি উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনে আন্দোলন করবে বরিশাল আইনজীবী সমিতি।
শুধু আইনজীবী সমিতি নয়, বরিশালে খাসজমি নিয়ে ভূমিহীন কৃষকদের আন্দোলনও দীর্ঘদিনের।
বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের প্রয়াত নেতা হারুন ভা-ারী খাসজমি ভূমিহীনদের মধ্যে বন্দোবস্ত এবং দখলদার উচ্ছেদের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছেন। ২০১৯ সালে তাঁর নেতৃত্বাধীন সংগঠন বরিশালে প্রায় ১২৩ একর খাসজমি ৩১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকার অভিযোগ তুলে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েছিল। সংগঠনটির দাবি ছিল, এসব জমি উদ্ধার করে প্রকৃত ভূমিহীন কৃষক-কিষানীদের মধ্যে বন্দোবস্ত করা। সেই সময় কৃষক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বরিশালের দুই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধেও সরকারি জমি দখলের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। এর মধ্যে সাবেক কাউন্সিলর নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এক একর জমি দখল করে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ এবং ফ্ল্যাট বিক্রির অভিযোগ ছিল। তবে সেটি ছিল কৃষক ফেডারেশনের করা অভিযোগ।
এখন প্রায় সাতবছর পর একই নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ডেফুলিয়ার খাসজমিতে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। যদিও তিনি এবারও জমিটি নিজের দাবি করে বলেছেন, জমিটি খাস নয়। ফলে পুরোনো অভিযোগ ও বর্তমান দাবির মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নির্ধারণের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ হলো ভূমি রেকর্ড যাচাই।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, ডেফুলিয়ার পশ্চিম পাশে প্রায় ২৬ একর খাসজমি রয়েছে। ভূমিহীন কৃষকদের বরাদ্দ পাওয়ার কথা থাকলেও তাদের অনেকে সেই জমি পাননি। বরং প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে জমিগুলো চলে গেছে বলে তাদের অভিযোগ। তবে এই অভিযোগেরও সরকারি রেকর্ডভিত্তিক নিশ্চিতকরণ এখনো হয়নি।
ডেফুলিয়ার এই জমির ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে সোনামিয়ার পুলসংলগ্ন এলাকায় ‘শহীদ জিয়াউর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৬ সেপ্টেম্বর সেখানে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে একটি নিমগাছ রোপণ করেন তিনি। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান পরিবর্তন করা হয়। প্রথমে গোরারপার এলাকায় স্থান নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কীর্তনখোলা নদীর তীরে কর্ণকাঠিতে ৫০ একর জমির ওপর বর্তমান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় না হওয়ায় ডেফুলিয়ার সেই জমি আর প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ব্যবহার হয়নি। দীর্ঘদিনের অব্যবহারের সময়েই জমিটির মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি খাসজমির একটি অংশ দখল হয়ে গেছে। আবার কিছু জমি ব্যক্তি ব্যক্তিমালিকানার বলে দাবি করছেন অনেকে। কোথাও স্থাপনা উঠেছে, কোথাও সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা হচ্ছে।
জমিটির বর্তমান রেকর্ড, খাসজমির সীমানা এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির পরিমাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা (সহকারী কমিশনার ভূমি) আজহারুল ইসলাম জানান, বিষয়টিতে কিছু জটিলতা রয়েছে। তিনি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। আগামী রোববার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখে এ বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারবেন।
তিনি বলেন, এসএ রেকর্ডে খাস ছিলো কিন্তু বিএস রেকর্ডে অনেক জমিই ব্যক্তি মালিকানায় এসেছে। আমরা প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেবার কাজ করছি।
এখন মূল প্রশ্ন, ডেফুলিয়ার প্রায় ৫০ একর জমির কোন অংশ খাস, কোন অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন, কোন দাগ ও খতিয়ানে জমিগুলো রয়েছে, কোনো অংশ বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে কি না এবং নামজারি হয়েছে কি না। একই সঙ্গে পশ্চিমের আরও প্রায় ২৬ একর খাসজমির বর্তমান অবস্থাও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
কারণ স্থানীয়দের অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু একটি সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূমিহীন কৃষকদের অধিকার, সরকারি খাসজমি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিন ধরে জমি দখলের অভিযোগ।
ভূমিহীন কৃষকের জন্য বরাদ্দযোগ্য জমি যদি বছরের পর বছর অব্যবহৃত থাকে এবং সেই সুযোগে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে শুধু একটি সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ বন্ধ করাই সমাধান নয়। প্রয়োজন পুরো জমির মালিকানা, দখল ও বরাদ্দের হিসাব প্রকাশ করা।
ডেফুলিয়ার পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তরের জায়গাটি তাই এখন শুধু একটি স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি সরকারি খাসজমি ব্যবস্থাপনা, ভূমিহীন কৃষকের অধিকার এবং প্রভাবশালী মহলের দখল নিয়ে বহুদিনের প্রশ্নের একটি দৃশ্যমান প্রতীক।