নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালের ৩০ খাল পুনরুদ্ধারে ৭৩০ কোটি টাকার প্রকল্প, বদলে যেতে পারে নগরীর চিত্র
নদী-খালের শহর বরিশালকে জলাবদ্ধতামুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বড় ধরনের উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নগরীর ৩০টি খাল পুনরুদ্ধার, পুনঃখনন, পাড় সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প অনুমোদনের কথা জানিয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। প্রকল্পের আওতায় ১০টি খালের সৌন্দর্যবর্ধন এবং ২০টি খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বরিশাল নগরীর খালগুলো দখল, দূষণ, ভরাট ও নাব্যতা সংকটে অস্তিত্ব হারানোর পথে। একসময় নগরীর পানি নিষ্কাশন ও নৌযোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল এসব খাল। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধ দখল এবং বর্জ্য ফেলার কারণে অনেক খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর দীর্ঘদিনের পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি খালকেন্দ্রিক পরিবেশ ও যোগাযোগব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বরিশালের খাল পুনরুদ্ধারে এর আগেও একাধিকবার উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালে নগরীর খালগুলোর পাড় সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও পুনঃখননের জন্য ৭০১ কোটি ৫৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়। এতে ৫৬১ কোটি ২৩ লাখ টাকা সরকারি অনুদান এবং ১৪০ কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে অর্থায়নের পরিকল্পনা ছিল। অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে সাতটি শর্তে অর্থায়নে সম্মতিও দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতির কথা জানানো হয়।
ওই পরিকল্পনায় নগরীর ৪৬টি খালের মধ্যে ২০টি খনন এবং আরও ৯টি খালের খনন, পাড় বাঁধাই, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এ ছাড়া এর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড নগরীর সাতটি খালের প্রায় ১৮ কিলোমিটার অংশ খননের উদ্যোগ নিয়েছিল। এ কাজে প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল। খালগুলোর মধ্যে ছিল সাগরদী, চাঁদমারী, ভাটার, জেল, আমানতগঞ্জ, পলাশপুর ও রূপাতলী খাল। প্রথম পর্যায়ে খনন এবং পরবর্তী সময়ে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, সীমানা নির্ধারণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল।
তবে বিভিন্ন সময়ে এসব উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নেওয়া হলেও নগরীর সব খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে নতুন ৭৩০ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে এবার নগরবাসীর প্রত্যাশা আরও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বরিশাল নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসতে পারে। খালের নাব্যতা ফিরে এলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি খালকেন্দ্রিক নৌযোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে খালের পাড় সংরক্ষণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও পরিকল্পিত সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে নগরীতে নতুন নাগরিক পরিসর গড়ে উঠতে পারে। এতে নগরীর পরিবেশের উন্নতির পাশাপাশি মানুষের বিনোদন ও চলাচলের সুযোগও বাড়বে।
তবে প্রকল্পের সুফল দীর্ঘস্থায়ী করতে খালের সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বর্জ্য ফেলা বন্ধ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০টি খাল নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বরিশাল সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বরিশালবাসীর পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিবৃতিতে প্রশাসক শিরিন বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন, আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এ প্রকল্প বরিশালকে পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে। নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়ন এবং বরিশালের নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে ৭৩০ কোটি টাকার এই প্রকল্প বরিশাল নগরীর জন্য সম্ভাবনাময় এক নতুন অধ্যায়। তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা, অতীতের মতো প্রকল্পটি যেন কেবল পরিকল্পনা ও কাগজপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দখল-দূষণে হারিয়ে যাওয়া খালগুলো ফিরে পাক প্রাণ, আর বরিশাল ফিরে পাক তার ঐতিহ্যবাহী খালনির্ভর নগরীর পরিচয়।'