
আল আমিন গাজী :: ‘রাখিব নিরাপদ দেখাব আলোর পথ’ বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটকে দীপ্তাক্ষরে এই স্লোগানটি লেখা থাকলেও, বাস্তবে ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে অনেক পরিবর্তন এলেও বরিশাল কারাগারে এখনো রয়ে গেছে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য। খোলস বদলে এক সময়ের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন নিজেদের ‘নির্যাতিত’ দাবি করলেও ভেতরে ভেতরে বহাল রেখেছেন পুরোনো সিন্ডিকেট। টাকার বিনিময়ে বন্দি আওয়ামী লীগ নেতাদের অবৈধ সুবিধা দেওয়া, মাদক চোরাচালান, বন্দি নির্যাতন এবং সরকারি সম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে কারাগারটিকে দুর্নীতির নিরাপদ আখড়ায় পরিণত করেছে একটি শক্তিশালী চক্র। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কারা মহাপরিদর্শক, উপ-মহাপরিদর্শক (বরিশাল), জেলা প্রশাসক এবং বরিশাল প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের অভিযোগ বক্সে জমা পড়া একাধিক লিখিত অভিযোগে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৫ জুন অফিস বক্সে এবং ২৮ জুন ডাকযোগে দৈনিক আজকের সময়ের বার্তা পত্রিকা অফিসেও এমন দুটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের বর্তমান সিনিয়র জেল সুপার সুব্রত কুমার বালার বাড়ি বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জে। ছাত্রজীবনে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকা এই কর্মকর্তা গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় কাশিমপুরের হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেদিন তার নির্দেশেই সেখানে গুলিতে ৫ জন নিহত এবং ৮০ জনেরও বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হন। এই রক্তাক্ত ঘটনার পর শাস্তিস্বরূপ তাকে ঢাকা হেডকোয়ার্টারে বদলি করা হলেও রহস্যজনক কারণে তাকে প্রথমে রাজশাহী এবং পরে বরিশালের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় কারাগারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বরিশালে যোগদানের পর থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাদের বিশেষ সুবিধাদানে ব্যস্ত রয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কারাগারের ডেপুটি জেলার সুমাইয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে আরও গুরুতর অভিযোগ। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা সুমাইয়া ছাত্রজীবনে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী ছিলেন এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ এমপির সুপারিশে চাকরিতে যোগ দেন। তার স্বামী রায়হান গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের বড় পদধারী এবং একাধিক রাজনৈতিক মামলার আসামি। বর্তমানে এই পলাতক আসামি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ডেপুটি জেলার সুমাইয়ার সরকারি কোয়ার্টারেই বহাল তবিয়তে অবস্থান করছেন। অভিযোগ রয়েছে, সুমাইয়ার প্রত্যক্ষ সহায়তায় গৌরনদীর প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা হারিছসহ কারাগারে বন্দি দলটির একাধিক নেতা মোবাইল ফোন ব্যবহারের অবৈধ সুবিধা পাচ্ছেন। কারাগারের সদ্য বিদায়ী জেলার মোহাম্মদ মাহবুব কবিরের (বাড়ি নরসিংদী) একক নিয়ন্ত্রণে কারাগারে চলেছে ব্যাপক লুটপাট। যোগদানের পর থেকেই তিনি কারাগারটিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক বাণিজ্য ও পুকুর চুরির মতো অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অবশেষে গত (২৮ জুন, ২০২৬-এর আগের দিন) তাকে তড়িঘড়ি করে বরিশাল থেকে বদলি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে যে, কারাগারের ভেতরের ৩৫ বছরের পুরোনো সরকারি সেগুন গাছ কেটে তিনি নিজের বাসার ফার্নিচার বানিয়েছেন। এছাড়া কারাগারের ভেতরের পুকুরের মাছ গোপনে তার বডিগার্ড সানাউল্লাহর মাধ্যমে পোর্টরোডের বাজারে বিক্রি করেছেন। কারাগারের মেডিকেল চৌকা থেকে ১০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় এবং কয়েদি শাকিলের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে মাসিক মাসোহারা তোলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি কারারক্ষী ডিউটি বণ্টনকারী মাঈনুলের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে তার বদলি ঠেকানোর মতো অনৈতিক কাজও করেছেন তিনি। কারাগারের অভ্যন্তরে মাদক প্রবেশের পেছনে একটি শক্তিশালী কারারক্ষী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সর্বপ্রধান কারারক্ষী বাদল, কারারক্ষী হানিফ এবং কারারক্ষী ডিউটি বণ্টনকারী সাবেক গেট অর্ডার মাইনুল এই মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতা। এছাড়া কারারক্ষী জুয়েল (গেট তল্লাশি) এবং গেট অর্ডার মাইনুল সরাসরি ভেতরে মাদক ঢোকাচ্ছেন। গত ১০ জুন কারাগারের নারী বন্দি সুবর্ণার কাছ থেকে ২১৫ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় এই কর্তৃপক্ষের জড়িত থাকার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। হানিফের ডিউটি না থাকা সত্ত্বেও জেলারের বিশেষ সুপারিশে তিনি নিয়মিত কারাগারে প্রবেশ করে মাদক সরবরাহ করতেন বলে জানা গেছে। এসব গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিনিয়র জেল সুপার, জেলার এবং ডেপুটি জেলারকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা কেউ কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজনস) অসিম কান্ত পালের সরকারি নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও তার পক্ষ থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কারাগারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া এবং এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা।

