ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২ জুলাই ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিউটি-কাকলি-সোনালীর পর বন্ধের পথে বরিশালের একমাত্র সিনেমা হল ‘অভিরুচি’

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
জুলাই ২, ২০২৬ ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৯৯

ফাহিম ফিরোজ :: এক সময় নতুন সিনেমা মুক্তি মানেই ছিল উৎসব। সকাল থেকেই টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন, পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখার পরিকল্পনা, আর হলজুড়ে দর্শকের করতালি ও উচ্ছ্বাস। বরিশালের মানুষের সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিউটি, কাকলি, সোনালী ও অভিরুচি সিনেমা হলের নাম। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই গৌরব এখন ইতিহাস। একে একে বন্ধ হয়ে গেছে বিউটি, কাকলি ও সোনালী সিনেমা হল। এখন কোনোমতে টিকে থাকা শেষ প্রেক্ষাগৃহ ‘অভিরুচি সিনেমা হল’ও দর্শক সংকটে অস্তিত্বের লড়াই করছে।

সরেজমিনে অভিরুচি সিনেমা হলে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে প্রদর্শিত হচ্ছে ‘কেয়ামত’ চলচ্চিত্র। বিশাল হলজুড়ে নিস্তব্ধতা। দুপুর ১২টার শো বহু আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দর্শক না থাকায়। বিকেল ৩টার শোতে মাত্র পাঁচজন এবং সন্ধ্যা ৬টার শোতেও পাঁচজন দর্শক সিনেমা দেখতে এসেছেন। কয়েকশ আসনের হল প্রায় ফাঁকা। এক সময় যেখানে একটি শোর সব টিকিট বিক্রি হয়ে যেত, সেখানে এখন হাতে গোনা কয়েকজন দর্শক নিয়ে চলছে প্রদর্শনী।

অভিরুচি সিনেমা হলের ম্যানেজার রেজাউল কবির বলেন, “দর্শক ধরে রাখতে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার ছবি চালাতে হচ্ছে। শুধু দেশীয় সিনেমা দিয়ে হল চালানো এখন কঠিন। গত বছর ‘প্রিয়তমা’ মুক্তির সময় কিছুদিন ভালো দর্শক হয়েছিল। এরপর আর কোনো সিনেমাই উল্লেখযোগ্য দর্শক টানতে পারেনি। প্রতিদিন লোকসান দিয়েই হল চালাতে হচ্ছে।”

হলের মালিক এবায়েদুল হক চাঁন বলেন, “বিদ্যুৎ বিল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ—সবকিছুর খরচ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় আয় নেই। বরিশালের শেষ সিনেমা হল হিসেবে এটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। তবে এভাবে দীর্ঘদিন লোকসান দিয়ে চালানো সম্ভব হবে না।”

হলে সিনেমা দেখতে আসা রিকশাচালক হুমায়ুন মিয়া বলেন, “ছোটবেলায় সিনেমা দেখতে হলে আসার জন্য অনেক অপেক্ষা করতাম। এখন মানুষ মোবাইলেই সিনেমা দেখে। তারপরও বড় পর্দায় সিনেমা দেখার আনন্দ অন্যরকম। এই হলটাও যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আর কোথাও সিনেমা দেখার সুযোগ থাকবে না।”

জানা গেছে, এক সময় বরিশাল নগরীতে চারটি সিনেমা হল ছিল—বিউটি, সোনালী, কাকলি ও অভিরুচি। নতুন ছবি মুক্তি পেলেই দর্শকের ঢল নামত। ঈদ কিংবা বিশেষ উৎসবে টিকিট পাওয়া ছিল কঠিন। কিন্তু কেবল দর্শক কমে যাওয়া নয়, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রসার, ইউটিউব, পাইরেসি, মানসম্মত চলচ্চিত্রের সংকট এবং প্রেক্ষাগৃহ আধুনিকায়নের অভাবে একে একে বন্ধ হয়ে যায় তিনটি হল। এখন শেষ আশ্রয় অভিরুচিও একই সংকটে।

দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদ বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক আযাদ আলাউদ্দীন বলেন, “সিনেমা হল শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। একটি শহরে সিনেমা হল না থাকলে নতুন প্রজন্ম বড় পর্দায় চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবে। সরকার, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগে জেলা শহরের প্রেক্ষাগৃহগুলোকে বাঁচাতে হবে।”

সংস্কৃতিবিদদের মতে, প্রেক্ষাগৃহ হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি ভবন বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; এটি একটি শহরের সাংস্কৃতিক চর্চা, পারিবারিক বিনোদন এবং সামাজিক মিলনস্থলের বিলুপ্তি। তাই বরিশালের শেষ সিনেমা হলটিকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিকায়ন, মানসম্মত চলচ্চিত্র প্রদর্শন, সরকারি প্রণোদনা এবং দর্শকবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

এক সময় যে প্রেক্ষাগৃহের সামনে নতুন সিনেমা দেখতে শত শত মানুষের ভিড় হতো, আজ সেখানে নীরবতা। বিশাল হলের অন্ধকারে জ্বলছে শুধু পর্দার আলো। সেই আলোও যদি একদিন নিভে যায়, তবে বরিশাল হারাবে শুধু একটি সিনেমা হল নয়—হারাবে তার কয়েক দশকের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।