
নিজস্ব প্রতিবেদক :: সরকারি স্কেলে বেতন পান কয়েক হাজার টাকা। পদবি—ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ‘ড্রাইভার’। অথচ তার চালচলন, আভিজাত্য আর অর্জিত সম্পদের ফিরিস্তি হার মানায় রাষ্ট্রের শীর্ষ আমলা কিংবা বড় কোনো শিল্পপতিকেও। রাজধানীর বছিলার অভিজাত গার্ডেন সিটিতে প্রায় ২ কোটি টাকার সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের বিশাল ফ্ল্যাট ও শেওড়াপাড়ায় কোটি টাকার ফ্ল্যাটের পাশাপাশি গ্রামের বাড়িতে আলিশান বাগানবাড়ি, যে বাড়ি নির্মাণে ব্যয় করা অর্থের পরিমাণ অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বাড়ির চেয়েও বেশি। বরিশাল শহরেও তার নামে রয়েছে দামি জমি। এর সবই তিনি গড়েছেন নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে।
রূপকথার মতো এ রাজকীয় জীবনের মালিক ফায়ার সার্ভিসের ড্রাইভার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে প্রভাবশালীদের সন্তুষ্ট করে এবং তাদের ক্ষমতার স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বরিশালের উজিরপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাবার সন্তান সাখাওয়াত। আর এ সম্পদ গড়েছেন ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন পদে নিয়োগ, বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে। নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে বারবার বরখাস্ত এবং বিভাগীয় মামলা হলেও তার বিরুদ্ধে নেই কোনো বড় ধরনের ব্যবস্থা। এই ড্রাইভারের ক্ষমতা এতই যে, তার দাপটে তটস্থ থাকেন ফায়ারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।
একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (গাড়িচালক) থেকে কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন সাখাওয়াত হোসেন, তার বিস্তারিত উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়িচালক সাখাওয়াত সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, তার উত্থান শুরু হয় জালজালিয়াতির মাধ্যমে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন সাখাওয়াত। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে একাধিক বিভাগীয় মামলাও হয়েছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়েও জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি নেওয়া এ সাখাওয়াতই পড়ে হয়ে ওঠেন নিয়োগ বাণিজ্যের হোতা।
উজিরপুরে আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি: সাখাওয়াতের সম্পদের তথ্য খুঁজতে গিয়ে তার দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী দেখা যায় তার নিজ জেলা বরিশালের উজিরপুর উপজেলায়। এ উপজেলার ওটরা ইউনিয়নের কেশবকাঠি গ্রামে তিনি গড়ে তুলেছেন চোখধাঁধানো ডুপ্লেক্স বাগানবাড়ি। প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর নির্মিত বাড়ির ভেতরে ও বাইরে আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ব্যবহার করা হয়েছে। নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়িটির দোতলার কাজ শেষে এখন তৃতীয়তলার কাজ চলছে। প্রথম ও দ্বিতীয় তলা গড়ে তোলা হয়েছে ডুপ্লেক্স বাড়ির আদলে। বাড়িটির বিশাল কক্ষগুলোতে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। বাড়ির জানালায় দামি গ্লাস বা কাঁচ ব্যবহারের পাশাপাশি টয়লেটসহ বাড়িটির সব কক্ষেই দামি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। আছে বিশেষ লাইটিং বা আলোকসজ্জাও। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি সাধারণ কোনো বাড়ি নয়, একটি রাজকীয় বাড়ি।
বিলাসবহুল বাড়িটি নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তা অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাড়ির চেয়েও বেশি। ভবনের ভেতর ও বাইরে যে ধরনের ডিজাইন এবং আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার দেখা গেছে, তা কোনো মন্ত্রী বা শিল্পপতির বাড়ির চেয়ে কম নয়। স্থানীয়দের মতে, বাড়িটি নির্মাণে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যা একজন সাধারণ ড্রাইভারের সারা জীবনের উপার্জনেও অসম্ভব। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা কালবেলাকে বলেন, একজন সাধারণ ড্রাইভার হয়ে সাখাওয়াত কয়েক কোটি টাকা খরচ করে আলিশান বাড়িটি নির্মাণ করেছেন। এ বাড়ি এমপি-মন্ত্রীদের বাড়ির চেয়েও উন্নত। বড় বড় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মন্ত্রীর বাড়িও এ বাড়ির কাছে হার মানাবে।
গ্রামে গিয়ে সাখাওয়াতের খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি চাকরি দিতে পারেন—এটা গ্রামের প্রায় সবাই জানে। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী সাখাওয়াতের বাড়ি উজিরপুর উপজেলার মশাংয়ে। তারা বাবা মৃত আনছার আলী মল্লিক ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সাখাওয়াত ড্রাইভারের চাকরি পাওয়ার পর থেকে পাল্টে যায় তার ভাগ্যের চাকা। তার গ্রামের একাধিক ব্যক্তি কালবেলাকে বলেন, টাকা নিয়ে তিনি আত্মীয়স্বজনসহ এলাকার অনেককে চাকরি দিয়েছেন। তাদের পারিবারিক অবস্থা অতটা ভালো ছিল না, সাখাওয়াত ফায়ার সার্ভিসে চাকরি পাওয়ার পর থেকে অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। তিনি মূলত অনেক ব্যক্তিকে ফায়ার সার্ভিসে চাকরি দেওয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন।
বরিশালের আলেকান্দায়ও রয়েছে জমি: বরিশাল শহরের মেইন পয়েন্ট আলেকান্দায়ও জমি কিনেছেন সাখাওয়াত। জাকির শরীফ নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের দাগ নম্বর ৬৭৯৪-এর জমিটি কেনেন তিনি। জমি বিক্রেতা মোহাম্মদ জাকির শরীফ বলেন, ২০০৭-৮ সালের দিকে তিনি আমার কাছ থেকে ৭ শতক জমি কিনেছিলেন, বর্তমানে এ জমির দাম কোটি টাকার ওপরে। এ ছাড়া বরিশালের চৌমাথায়ও তিনি অনেক জমি কিনেছেন বলে শুনেছি।
তিনি বলেন, সাখাওয়াত নিজেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে জাহির করতেন। প্রায়ই বরিশাল ডিসি অফিসের একজন পিয়ন জুয়েলকে সঙ্গে নিয়ে আসতেন, যাকে তিনি কোনো এক ম্যাজিস্ট্রেটের আত্মীয় বা ভাতিজা হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় দাপট দেখাতেন। সাখাওয়াত তার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখাতেন।
রাজধানীর শেওড়াপাড়া ও বছিলায় বিশাল ফ্ল্যাট: এলাকার পাশাপাশি সম্পদ গড়েছেন রাজধানী ঢাকায়ও। রাজধানীর শেওড়াপাড়া ও বছিলা এলাকায় ফ্ল্যাট রয়েছে সাখাওয়াতের। সরেজমিন দেখা যায়, মোহাম্মদপুর সংলগ্ন বছিলা গার্ডেন সিটিতে গার্ডেন রাজধানী বিল্ডার্স নামে একটি ভবনে ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন ড্রাইভার সাখাওয়াত। ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা।
রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় ১ হাজার ৪৫০ বর্গফুটের আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে সাখাওয়াতের। ৭ হাজার টাকা বর্গফুট দরে কেনা এ ফ্ল্যাটটির মূল্য ১ কোটি টাকারও বেশি। এ ছাড়া রাজধানীর ডেমরা কোনাবাড়িতে ‘মিনি কক্সবাজার’খ্যাত এলাকার একটি ডেভেলপার প্রজেক্টে তার চারটি শেয়ার ছিল, যার মধ্যে দুটি তিনি সম্প্রতি পুলিশের এক কর্মকর্তার কাছে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এবং নামে-বেনামে আরও প্রচুর সম্পদ এবং রাজধানীতে আরও ফ্ল্যাট থাকার গুঞ্জন রয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সাখাওয়াত একজন সাধারণ গাড়িচালক হলেও বছিলা বা শেওড়াপাড়ার প্রতিবেশীরা তাকে চিনতেন ফায়ার সার্ভিসের একজন ‘বড় অফিসার’ হিসেবে। তিনি প্রায় সময় ল্যান্ড ক্রুজার বা প্রাডোর মতো দামি গাড়ি নিয়ে ফ্ল্যাটে যাতায়াত করেন। কিন্তু আশপাশের কেউ জানতেন না তিনি পেশায় একজন ড্রাইভার। তার চলাফেরায়ও আভিজাত্যের ছোঁয়া স্পষ্ট। ডিউটির বাইরে তিনি সবসময় ফিটফাট হয়ে চলাফেরা করেন এবং বিলাসবহুল হোটেলে রয়েছে সাখাওয়াতের নিয়মিত যাতায়াত।
ড্রাইভারের আড়ালে ‘নিয়োগ সম্রাট’: একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হয়ে সাখাওয়াত কীভাবে এ বিশাল সম্পদের মালিক হলেন, তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, ফায়ার সার্ভিসের ভেতরে ঊর্ধ্বতন থেকে শুরু করে নিচের পদের কর্মচারীদের সমন্বয়ে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা সংস্থাটির নিয়োগ এবং বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। সাখাওয়াত ড্রাইভারের আড়ালে এ সিন্ডিকেটের ‘নিয়োগ সম্রাট’। অবৈধ এসব কাজে জড়িত সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেন এ সাখাওয়াত। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে তিনি ফায়ার সার্ভিসে ‘নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যের’ অঘোষিত সম্রাট হয়ে ওঠেন। শুধু ফায়ার সার্ভিস নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও তিনি যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফায়ার সার্ভিসের সাবেক এক মহাপরিচালকের (ডিজি) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বা ‘ডান হাত’ ছিলেন সাখাওয়াত। ওই ডিজির দুই বছরের মেয়াদে সাখাওয়াত একাই নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে সাত থেকে ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। তিনি কর্মকর্তাদের কক্ষের গতিবিধি নজরদারি করার জন্য নিজস্ব ‘স্পাই’ বা গোয়েন্দা বাহিনীও গড়ে তুলেছিলেন, যাদের কাজ ছিল তাদের রুমে কারা আসছেন-যাচ্ছেন, সেগুলো নজরদারি করা। একজন গাড়িচালক হলেও সাখাওয়াতের প্রভাব অনেক, ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাদের নিজস্ব পদোন্নতি বা বদলির বিষয়ে ড্রাইভার সাখাওয়াতের শরণাপন্ন হন। এ ছাড়া নিবন্ধনহীন অনলাইন ও ভুয়া সাংবাদিকদের দিয়ে সাখাওয়াত বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ব্ল্যাকমেইল করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাখাওয়াত ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় ‘ডেপুটেশনে’ থেকে সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের গাড়ি চালাতেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতনদের ড্রাইভার হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি, সেই সুযোগটি তিনি সুকৌশলে তার এসব নিয়োগ বাণিজ্যের কাজে ব্যবহার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান শিকদারের বাড়িও উজিরপুর হওয়ায় তার ক্ষমতার অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি করেছেন সাখাওয়াত। এভাবে বড় কর্মকর্তাদের সান্নিধ্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি ফায়ার সার্ভিসে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তোলেন। সেই প্রভাবে ড্রাইভার হয়েও তিনি নিয়মিত গাড়ি চালাতেন না। বেশিরভাগ সময় তিনি এসব কাজে ব্যস্ত থাকতেন।
ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তা এবং তার পরিচিতজনরা কালবেলাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। বারবার তার এ অপরাধ প্রমাণিত হলেও তার বিরুদ্ধে কখনো বড় ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তারা জানান, মূলত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক এবং তাদের সন্তুষ্ট রেখে অপরাধ করেন। সাখাওয়াত হোসেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খুশি করতে নিয়মিত বিভিন্ন উপঢৌকন দিতেন। যার যেটা পছন্দ সাখাওয়াত তাদের সেটা সরবরাহ করতেন। বেশিভাগ ক্ষেত্রে তিনি কর্মকর্তাদের বাসায় ভোলা থেকে বড় বড় ইলিশ মাছ পাঠাতেন। এ ছাড়া নারী, মদ এবং আর্থিক সাপোর্টও দিতেন। এভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য চালাতেন।
নিজের চাকরি দিয়েই প্রতারণা ও জালিয়াতি শুরু: ফায়ার সার্ভিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাখাওয়াতের এ উত্থানের শুরুই হয়েছিল জালিয়াতির মাধ্যমে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন সাখাওয়াত। পরে এ জালিয়াতি প্রমাণ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী আইনে ২০০৭ সালে বিভাগীয় মামলা হয়। শাস্তি হিসেবে এক বছরের বেতন কর্তন এবং তিরস্কারের দণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নাম করে মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত থাকায় একাধিক বিভাগীয় মামলা: বিভিন্ন সময়ে চাকরি দেওয়ার নাম করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একাধিক রেকর্ড রয়েছে সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে। নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে একাধিকবার বিভাগীয় মামলা হয়। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে রিয়াদ আহমেদ নামে এক ব্যক্তিকে ফায়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য চুক্তি করেছিলেন সাখাওয়াত। মৌখিক পরীক্ষায় বোর্ডের সন্দেহ হলে সেই চুক্তির কথা স্বীকার করে নিয়োগপ্রার্থী রিয়াদ। পরবর্তী সময়ে এ অপরাধে সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। কিন্তু শুধু ‘তিরস্কার দণ্ড’ দিয়েই বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি করা হয়।
এতেও থামেননি সাখাওয়াত। মো. আনিসুর রহমান নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে তার ভাগনে মো. রণ মাহবুবকে ফায়ার সার্ভিসে ফায়ারফাইটার পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা নেন সাখাওয়াত। আনিসুর রহমানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় আবারও সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুধু ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেন তৎকালীন ডিজি। এভাবে বারবার নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে বড় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অপরাধ করেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও থামেনি। এখনো তিনি নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। সবশেষ চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করায় তার বিরুদ্ধে ফের তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন। বরাখাস্তের পর তাকে সুনামগঞ্জে শাল্লায় বদলি করা হলেও তিনি কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করে বদলিকৃত স্থানে যোগদান করেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও নৈতিক স্খলন, মামলা: সাখাওয়াত হোসেন শুধু দুর্নীতির মাধ্যমেই সম্পদ গড়েননি, বরং তিনি পেশাগত শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং পারিবারিক সহিংসতার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন, যার ফলে তাকে ফায়ার সার্ভিস থেকে বরখাস্ত হতে হয়েছে এবং একাধিক ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সম্প্রতি তার স্ত্রী আফরোজা খানম তার বিরুদ্ধে যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও পরকীয়ার অভিযোগে একাধিক মামলা করেছেন। পারিবারিক ঝামেলা নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা এবং বদলিকৃত স্থান সুনামগঞ্জের শাল্লায় যোগদান না করে সরকারি আদেশ অমান্য করায় তার বিরুদ্ধে আরও একটি সাময়িক বহিষ্কারাদেশ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল কালবেলাকে বলেন, সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এবার অত্যন্ত কঠিনভাবে দেখা হচ্ছে। এর আগে তাকে ছোটখাটো শাস্তি বা তিরস্কার করে ছেড়ে দেওয়া হলেও এবার তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সাখাওয়াতের অস্বাভাবিক সম্পদের বিষয়ে ডিজি বলেন, আমাদের কাছেও বিভিন্ন সময় অনেক তথ্য ও নথি আসে, সব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে ওঠা নিয়োগ বাণিজ্য এবং শৃঙ্খলাভঙ্গসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এরই মধ্যে তাকে প্রাথমিকভাবে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।
সাখাওয়াতকে সুনামগঞ্জের শাল্লায় বদলি করা হলেও সেখানে তার যোগদান না করার বিষয়ে ডিজি বলেন, তিনি কেন জয়েন করেননি বা কেন অনুপস্থিত আছেন, তা আমাদের আইনগত পদ্ধতির মাধ্যমেই আমরা দেখছি। ফায়ার সার্ভিসের অভ্যন্তরে সাখাওয়াতের মতো প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিষয়ে ডিজি বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ ধরনের অনিয়মগুলো বন্ধ করার এবং অধিদপ্তরে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি। রাতারাতি সব পরিবর্তন সম্ভব না হলেও যথাযথভাবে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অভিযুক্ত সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও সেটা সম্ভব হয়নি। তার ব্যবহৃত একাধিক নম্বরে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। জানা গেছে, সাখাওয়াত কিছুদিন পর নম্বর পরিবর্তন করেন এবং অপরিচিত নম্বরের কল ধরেন না। কয়েক মাধ্যমে চেষ্টার পর তার একটি নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া সম্ভব হয়। তবে কয়েকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেনি। পরবর্তী সময়ে পরিচয় দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও সাড়া মেলেনি সাখাওয়াত হোসেনের।
তথ্যসূত্র:- দৈনিক কালবেলা।

