
এবি সিদ্দীক ভূইঁয়া :১৭ দেশে ২৫ বার ভ্রমণ গণপূর্তের প্রকৌশলী কাজী ফিরোজের
কাজী মো. ফিরোজ হাসান ১৭ দেশে কমপক্ষে ২৫ বার ভ্রমণ করেছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) কাজী মো. ফিরোজ হাসান সরকারি সফরে ১৭ দেশ ভ্রমণ করেছেন। নিজে সম্পৃক্ত নন, এমন অনেক প্রকল্পেও নাম বসিয়ে ১৭ দেশে কমপক্ষে ২৫ বার ভ্রমণ করেছেন বলে জানা গেছে।
কাজী ফিরোজ হাসান নিজেকে সৎ কর্মকর্তা দাবি করলেও চাকরির প্রায় পুরোটা সময় ঢাকায় অবস্থান করে তিনি সব সময় বিদেশ ভ্রমণে যুক্ত আছেন। তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর প্রকিউরমেন্ট এস্টেট ও কনস্ট্রাকশন ইউনিটে (পেকু) কর্মরত থাকায় তাকে ‘পেকু ফিরোজ’ নামেই সবাই চেনেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) কাজী মো. ফিরোজ হাসানের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ গুলো তুলে ধরা হল:
১। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) কাজী মো. ফিরোজ হাসানের বিরুদ্ধে ট্রেনিং ও সরকারি সফরের নামে নিজের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন বিভিন্ন প্রকল্পে নাম যুক্ত করে ১৭টি দেশে অন্তত ২৫ বার ভ্রমণের মাধ্যমে অর্থ অপচয় ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। (উল্লেখ্য, তিনি স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী নন, বরং গণপূর্ত অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা)।
২।বিদেশ ভ্রমণ ও অনিয়ম সংক্রান্ত
অভিযোগ অতিরিক্ত বিদেশ ভ্রমণ: নিজের দাপ্তরিক কাজের পরিধির বাইরের বিভিন্ন প্রকল্পে নাম ও সুযোগ ব্যবহার করে ১৭টি দেশে প্রায় ২৫ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।
৩।প্রশিক্ষণের অপব্যবহার: বিদেশে অফিশিয়াল ট্রেনিং বা সফরের নামে সরকারি তহবিলের অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে এই ভ্রমণগুলো সম্পন্ন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ কর্মকর্তা বিগত সরকারের সময় সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রকল্পে সম্পৃক্ত থেকে বেশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। ২০২৪ সালের আগস্টে পট পরিবর্তনের পর একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে ধরে নিজের প্রভাব চলমান রাখেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রকৌশলী ফিরোজ হাসানের চাকরির বয়স প্রায় ২৮ বছর। খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করার পর খুলনা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। এরপর ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ এ স্টাফ অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন ফিরোজ হাসান। সেই বছরই মার্চ মাসে বদলি হয়ে আসেন সাভার গণপূর্তে।
পেকু ফিরোজ ২
যেসব জায়গায় কাজী ফিরোজ হাসানের
পিপিসি বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী-৩ পদে ২০০১ সালে ঢাকায় বদলি হন এই কর্মকর্তা। সেই যে তিনি ঢাকায় ঢুকেছেন, মাঝে ২০০৯ সালে এক মাসের জন্য নেত্রকোনায় কাজ করা ছাড়া বাকিটা সময় ঢাকাতেই আছেন। চাকরি জীবনের প্রায় পুরোটা সময় ফিরোজ হাসানের ঢাকায় থাকার বিষয়টি নিয়ে গণপূর্তে তার সহকর্মীদের অনেকের মধ্যে ক্ষোভও আছে।
ঢাকা থাকার বিষয়টি নিয়ে ফিরোজ হাসান বলেছেন, ‘আমি ঢাকায় আছি ঠিক আছে। কিন্তু আমি ছিলাম প্রজেক্টের কাজে, ওয়ার্কিংয়ে তো ছিলাম না। আর প্রজেক্টের এই কাজগুলো তো নন প্রফিটেবল।
আয়নালস্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে বিদেশ ভ্রমণের হিড়িক
তবে সহকর্মীদের সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ– লম্বা সময় ধরে তার একই বিভাগে পদায়ন নিয়ে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে তিনি ঢাকায় গণপূর্তের প্রকিউরমেন্ট এস্টেট ও কনস্ট্রাকশন ইউনিটে (পেকু) বদলি হন। সেই থেকে এই বিভাগেই কর্মরত আছেন ফিরোজ হাসান। ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ছিলেন এই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে। আর এখন সংস্থাপন শাখার পাশাপাশি পেকু বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে রয়েছেন।
গণপূর্তের পেকু বিভাগ মূলত ক্রয়সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ করে থাকে। ১৭ বছর পেকু বিভাগে থাকার কারণেই গণপূর্তে ফিরোজ হাসানকে সবাই ‘পেকু ফিরোজ’ হিসেবে চেনেন।
পেকু ১
যেসব দেশে ভ্রমণ করেছেন কাজী ফিরোজ
এ তো গেল ফিরোজ হাসানের ঢাকায় থাকা আর পেকু নামের গল্প। এই কর্মকর্তার আরেকটি কাজ হলো ট্রেনিংয়ের নামে বিদেশ ভ্রমণ। ফিরোজ হাসানের বিদেশ ভ্রমণ শুরু ২০০৯ সালের জুন থেকে। সরকারের অর্থায়নে সেসময় তিনি ৬ দিনের জন্য ‘ফ্যাসিলিটি মডার্নাইজেশন’ শিরোনামে ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিংয়ে যান মালয়েশিয়ায়। এরপর একে একে ঘুরে এসেছেন জাপান, মিসর, ইতালি, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়া, স্পেন, ভারত, তুরস্ক, বেলজিয়াম, গ্রিস, ফিনল্যান্ড ও বুলগেরিয়া। সেন্ট্রাল এসি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক একটি ট্রেনিংয়ে তার এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল। বিমানবন্দর গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত আর যেতে পারেননি।
বিদেশ ভ্রমণের বিষয়ে ফিরোজ হাসান বলেছেন, ‘আমি আসলে এতগুলো ট্রেনিংয়ে যাইনি। আরও কম হবে। আপনি গণপূর্তে খোঁজ নিয়ে দেখেন, আরও অনেকেই আছে, যারা ট্রেনিংয়ে যায়। আমার চেয়ে বেশি গেছে, এমন অনেককেও পাবেন আপনি।’
তার সহকর্মীদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, নিজের অদক্ষতার কারণে ওয়ার্কিং বিভাগে চাকরি করেননি ফিরোজ হাসান। নিজের অদক্ষতা ঢাকতে বিভাগটির সব কর্মকর্তাকে ঢালাওভাবে দুর্নীতিবাজ বলে বেড়াতেন।
গণপূর্ত লটারি গণপূর্তে স্বজনপ্রীতির লটারিতে কেপিআই ‘খেলা’
চব্বিশের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ফিরোজ হাসান একটি রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে তৎপরতা চালান বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ প্রকৌশলী সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলামের আশীর্বাদ পেয়ে নিজ সংস্থার সহকর্মীদের পেছনে কলকাঠি নাড়ার মতো কাজটিও করেন। তিনি গণপূর্ত বিভাগের সব কর্মকর্তার ‘আমলনামা’ গোপনে সচিব নজরুল ইসলামকে সরবরাহ করেন। আর সেই সচিব আর মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলমকে সঙ্গে নিয়ে সংস্থার বিষয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কান ভারী করেন। এতে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ক্ষিপ্ত হয়ে পদায়নে লটারি পদ্ধতি শুরু করেন। যার ফলাফল হয়েছে দৈনন্দিন কাজে স্থবিরতা।

