ঢাকাTuesday , 25 August 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পিয়ন থেকে কোটিপতি : বরিশালে বিসিআইসি কর্মকর্তা শাহ আলম গাজীর বিপুল সম্পদের পাহার, আয়ের উৎস? 

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৮১

নিজস্ব প্রতিবেদক :: পিয়ন থেকে কোটিপতি : বরিশালে বিসিআইসি কর্মকর্তা শাহ আলম গাজীর বিপুল সম্পদের পাহার, আয়ের উৎস?

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-এর বরিশাল বাফার গোডাউনের ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ শাহ আলম গাজীকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সরকারি সার পরিবহনে কারসাজির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘তালাশ বিডি’র দীর্ঘ অনুসন্ধানে এই কর্মকর্তার আলাদিনের প্রদীপের মতো আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার নানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)-এ পিয়ন পদে চাকরির মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন শাহ আলম গাজী। পরবর্তীতে তিনি বরিশালে ফায়ারম্যান পদে যোগ দেন। দীর্ঘ চাকরিজীবনে বর্তমানে তিনি বরিশাল বাফার গোডাউনের ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির সীমিত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন তিনি। এর মধ্যে বরিশাল নগরীর ১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাদ্রাসা সড়কে নির্মিত হয়েছে পাঁচতলা আবাসিক ভবন ‘গাজী ম্যানশন’। ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে এটি নির্মাণের দাবি করা হলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিজের অর্থায়নেই জমি ক্রয় ও ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। কার্যত ব্যাংকের ঋণ নেওয়া হয়েছে শুধু কৌশল অবলম্বন করে—এমন অভিযোগও রয়েছে।

বরিশালের বাকেরগঞ্জ সরকারি কলেজ সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের জমি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। নিজের নামে গাড়ি না থাকার দাবি করলেও পরিবারের ব্যবহারের জন্য রয়েছে ‘নিসান’ ব্র্যান্ডের একটি দামি গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৫-৫৬৫২), যা তার স্ত্রীর নামে নিবন্ধিত।

ঘাট শ্রমিকদের সূত্রে জানা গেছে, যশোরের নওয়াপাড়া থেকে বরিশাল রুটে সার পরিবহনের কাজে নিয়োজিত ‘এমবি হাক্কানী’ ও ‘এমবি মুন্নি’ নামে দুটি কার্গো জাহাজ শাহ আলম গাজীর নিজের মালিকানাধীন।

শাহ আলম গাজীর পরিবারের সদস্যদের নামে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়ে কোটি কোটি টাকার সরকারি কাজ বাগিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তার ছেলের নামে রয়েছে ‘গাজী বিল্ডার্স (লিমিটেড)’ নামের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি লাইসেন্স।

তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ‘মেসার্স মুন্নি এন্টারপ্রাইজ’ নামের আরেকটি প্রথম শ্রেণির লাইসেন্স।

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এসব ঠিকাদারি ব্যবসা বাস্তবে শাহ আলম গাজী নিজেই পরিচালনা করেন এবং ছেলের ব্যাংক হিসাবে নিয়মিত বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়।

বাফার গোডাউনের সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে।

নরসিংদীর ঘোড়াশাল থেকে বরিশালের উদ্দেশ্যে পাঠানো সার নির্ধারিত বাফার গোডাউনে আনলোড না করে সরাসরি বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে পৌঁছে দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারি নথিপত্রে তা গোডাউনে গ্রহণ বা আনলোড দেখানো হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।

যশোরের নওয়াপাড়া থেকে কার্গো জাহাজে আসা সার রাতের আঁধারে গোডাউন বাইপাস করে সরাসরি ডিলারের কাছে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

গোডাউনে সার রিসিভ না করেও ভুয়া নথিতে স্বাক্ষর করে যাতায়াত ও পরিবহন খরচের সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

স্থানীয় কেডিসি এলাকার বাসিন্দারা জানান, সরকারি পদে থেকে দীর্ঘদিন একই স্থানে ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ হিসেবে বহাল থাকা বিসিআইসির নীতিমালার পরিপন্থী। সাবেক এক কর্মকর্তার দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় মিছিলে অংশ নেওয়ার ছবি সংরক্ষিত রয়েছে। তবে গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি রাতারাতি জামায়াতের কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করছেন।

সম্প্রতি শাহ আলম গাজীর বিরুদ্ধে অনিয়ম দুর্নীতি বিরুদ্ধে তালাশ বিডির প্রকাশিত সংবাদ দামাচাপা দিতে ও নিজের বদলি ঠেকাতে তিনি ২২ই আগস্ট ঢাকায় গিয়ে,বিসিআইসি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিভাগীয় প্রধান (বিপণন) জনাব মোঃ মঞ্জুর রেজাকে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করেছেন বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্র দাবি করেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো স্বতন্ত্র বা নির্ভরযোগ্য দাপ্তরিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল বিভাগীয় সভাপতি রনি সিকদার জানান, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, সার অ-ব্যবস্থাপনা ও ঠিকাদারি অনিয়মের অভিযোগ অতীব গুরুতর। যদি ,বিসিআইসি বা দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ গুলো স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে । অন্যথায় জনস্বার্থে সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে।

সার্বিক বিষয়ে শাহ আলম গাজীর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করে ছেলে ও স্ত্রীর ঠিকাদারি ব্যবসা, চালানের অনিয়ম ও সার পাচারের বিষয়ে নির্দিষ্ট লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

(তালাশ বিডির অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। পরবর্তী পর্বে শাহ আলম গাজীর সম্পদ ও সার পরিবহনের ভিডিও মাধ্যমে তালাশ বিডিতে নথিপত্র প্রকাশ করা হবে।)